প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় হয়েছে ৩১ কোটি ৫২ লাখ ১৭ হাজার টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ না পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি এবং ডিসেম্বর ২০২৪ এর মধ্যে প্রকল্পের নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই ব্যয় ব্যতিরেকে মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৫ নাগাদ বাড়ছে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল খামারি পর্যায়ে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রাণী পুষ্টির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখা। প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী খামারিদের মধ্যে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ প্রযুক্তি সাইলেজ সম্প্রসারণ করাসহ উন্নত জাতের কাঁচা ঘাস চায় এবং সাইলেজ প্রযুক্তি জনপ্রিয় করা। গবাদিপশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ কাঁচা ঘাস সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে হৃষ্টপুষ্ট করা এবং গো-খাদ্যের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা।
অথচ প্রকল্পের টাকায় বিদেশ ভ্রমণের কথা আসায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। ১১৭ কোটি টাকার চলমান এ প্রকল্পের আওতায় বিদেশ যাত্রায় খরচ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রত্যেক কর্মকর্তা খরচ বাবদ পাবেন ১০ লাখ টাকা।
নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এ প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা। গত চার বছরে এ খাতে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় বিদেশ সফর হয়নি। নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে এক বছর। বর্ধিত ডিপিপিতেও (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘাস চাষ শিখতে বিদেশ ভ্রমণে অর্থব্যয় করতে চান না সরকার সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, দুধ উৎপাদন বাড়ানো ও খামারিদের লাভবান করতেই এমন উদ্যোগ। খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বাড়াতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। কাঁচা ঘাস সহজপ্রাপ্য হলে গাভি পালনও সহজতর হবে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করতে হবে। সেজন্য দরকার ব্যাপকভাবে উচ্চ উৎপাদনশীল ঘাস চাষ। নেপিয়ার ঘাসের চার-পাঁচটি জার্মপ্লাজম দেশে আনা হবে। এগুলো কীভাবে প্রস্তুত করা যায়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন কর্মকর্তারা। কীভাবে সারা দেশের খামারি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়, ল্যাবরেটরিতে জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে তিনটি দেশে কর্মকর্তারা যাবেন।
খামারি পর্যায়ে উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় করার মাধ্যমে গবাদিপশুর পুষ্টির উন্নয়ন করা প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। এ ছাড়া প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় খামার পর্যায়ে প্রাণী পুষ্টি উন্নয়ন প্রযুক্তি প্রদর্শন ও দুর্যোগকালীন গো-খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সাইলেজ প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ।
এ ছাড়া সাভারে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে স্থায়ী জার্মপ্লাজম নার্সারি স্থাপন করাসহ ৮ হাজার ৯৭০টি উচ্চ উৎপাদনশীল উন্নত জাতের স্থায়ী বা অস্থায়ী ঘাসের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হবে। সম্প্রসারণ করা হবে বিদেশ থেমে আমদানি করা নেপিয়ার-১ জার্মপ্লাজম। বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণের জন্য ১৭ হাজার ৯৪০টি খামারে লাগসই প্রযুক্তি (সাইলেজসহ) হস্তান্তর করাসহ অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ ঘাসের বীজ বিতরণ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স খাদ্য এবং কৃমিনাশক বিতরণ, কমিউনিটি এক্সটেনশন এজেন্ট নির্বাচন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রাণী পুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ক্যাম্পাস নার্সারি উন্নয়ন ও প্রদর্শনী ঘাসের ২৩ প্লট স্থাপন বাবদ ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে প্রতিটি প্লট তৈরিতে খরচ ধরা হয় ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৪৭৫ উপজেলায় প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের লক্ষ্য ধরা হয়। এজন্য খামারিরা সরকারের কাছে থেকে পাবেন ১০ হাজার টাকা। বরাদ্দের এই টাকা পাবেন দুই কিস্তিতে। খামারির ১০ শতাংশ জমি ঘাস চাষের উপযুক্ত হলেই এই বরাদ্দ মিলবে।
৩২ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক আমজাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটি চলমান রয়েছে। বর্তমানে অগ্রগতি প্রায় ৩০ শতাংশ। আমরা বরাদ্দ ঠিকমতো পাইনি। তাই অগ্রগতি ভালো হয়নি।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণ একদমই না। ঘাস উৎপাদন, মশা মারার প্রশিক্ষণ এগুলোর জন্যে বিদেশ যাওয়াটা শুধু নামে। মূল বিষয়টা হচ্ছে বিদেশ গেলে সে রাষ্ট্রীয় টাকায় ভ্রমণের সুবিধা পাচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান এ বিষয়ে বলেন, আমি নতুন মানুষ। আসলে বর্তমান সরকার কৃচ্ছ্বতা সাধনসহ অর্থ অপব্যয় রোধে বারবার কর্মকর্তাদের বলছেন। কিন্তু কিছু কর্মকর্তারা বিষয়টা আমলে নিচ্ছেন না। আমি এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলব। তারা প্রশিক্ষণের জন্য যেতে চায় নাকি অন্য কোনো কারণ আছে সেটি আলোচনা করা হবে।