উল্লেখ্য প্রতিবছরের ন্যায় এবার ও নির্দিষ্ট দিনে আশ্রমে গুরুবার্ষিকী উদযাপনের সকল প্রস্তুতি ছিল। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয় দেশের প্রথম সারির বাউল শিল্পী ও সাধকদের। প্রতিবছরের ন্যায় এবার ও হওয়ার কথা ছিল লালন ফকিরের জীবনদর্শন ও লালন আদর্শ নিয়ে ছিল সুগভীর তত্ত্ব আলোচনা।
লালন ভক্তগণের লালন দর্শন প্রচার, প্রসার ও লালন চর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই লালন আশ্রম। নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান মেনে প্রতিবছর এখানে সাধুসঙ্গ ও লালন মেলার আয়োজন হয়ে আসছিল।
উল্লেখ্য ২২ ও ২৩ শে নভেম্বর; রোজ শুক্রবার ও শনিবার ' মহতী সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা' অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এবারই প্রথম কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হয়ে বন্ধ হয়ে গেল এই সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা।
উল্লেখ্য এ আয়োজন উপলক্ষে আশ্রম ও লালন একাডেমির চত্বরে ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। অনুষ্ঠান স্থলে ছিল ডেকোরেশন প্যান্ডেল ও পাশেই ছিল ভক্ত সমাগমস্থল, যেখানে দুদিন আগে থেকেই ছিল বিভিন্ন দোকান, স্টলসহ মেলার সকল আয়োজন।
আগত সাধুদের পথিমধ্যেই ফিরে যেতে বলা হয়েছে বলে জানান আয়োজকেরা। তারা জানান, একশ্রেণির মানুষ দূর দুরান্তের অতিথিদের আশ্রমের দিকে আসতে বাধা দেয়। দূরের ও ভিন্ন জেলার অতিথিদের আশ্রমের সামনে থেকে চলে যাওয়া এবং সাধুদের বিন্দুমাত্র বিশ্রামের সুযোগ না দিতে পারা, সাধুদের আপ্যায়ন করতে না পারায় চরম ভাবে হতাস হয়ে পড়েন আয়োজকেরা।
এসময় আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ফকির শাহ্ জালাল জানান, আমি ফকির মানুষ, ফকির কিংবা সাধকের জীবন অন্যদের থেকে আলাদা, আমি গুরুকরণ মেনে চলি, আমার আশ্রমে যারা আসে সবাই গুরুবাদী, তাদের দর্শন মানবতাবাদী, লালন ফকির মানবতাবাদী দার্শনিক,তিনি মানবসেবার কথা বলেছেন, আমি সেভাবে চলার চেষ্টা করি। ফকিরদের সংসার থাকেনা, আমার নিজের ও সংসার নেই, বাউল সাধু-গুরু গণ হলো আমার সংসার। তিনি বলেন আমি এই আশ্রম অনেক ভালবাসি, এর জন্য অনেক কিছুই করেছি, নিজের জমিও দিয়েছি, এটা করেছি বঞ্চিত আর নিপীড়িত বাউলদের জন্য।
ফকির শাহ্ জালাল জানান, সুফি সাধক, পাগল আর সাধু সন্ন্যাসী দের জন্য আমি অনেক কিছুই করতে চাই, বাউলেরা লালন ফকিরের আশ্রম ভালবাসে যার কারণে সবাই এই আশ্রমে ছুটে আসে। কিন্তু এবার তাদের পথ থেকেই একশ্রেণির মানুষ ফিরিয়ে দিয়েছে।
আশ্রমের এক ভক্ত জানান, বাউল হলো জাতিসংঘের ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য, সরকার কখনো চায়না লালন মেলা বন্ধ করতে কিন্তু একটি মহলের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে আজকের এই অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। উপস্থিত ভক্তগণ জানান, লালনকে কিছু মানুষ এখনো চিনতে ও বুঝতে পারেনি যার কারণে বিভিন্ন জায়গায় এমনভাবে অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আশ্রমের একজন আয়োজক জানান 'এবার আমাদের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেল, সেই সাথে ভক্তদের আশ্রমে প্রবেশ করতে না দেয়ায় ব্যাপক পরিমাণ খাবারের অপচয় হলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এই দুইদিন আশ্রমে কোন প্রকার গানবাজনা ও সাধু সমাবেশ হয়নি, আশ্রমের তরফ থেকে জানানো হয়, ঘরের মধ্যে কোন ধরণের স্পিকার ব্যবহার না করে লালন গান করতে চাইলে ও অনুমতি মেলেনি। ফলে মুক্তিধাম লালন আশ্রম ছিল সম্পুর্ন ফাঁকা, স্থানীয় জনগণের কাছে মেলা বন্ধের কারণ জানতে চাইলে তারা এবিষয়ে কোন মন্তব্য করেন নি, প্রশাসন ও এব্যাপারে কোন মন্তব্য করে নি।
এদিকে সাধুসঙ্গ ও লালন মেলা বন্ধ এবং মেলায় আগত সাধু ও লালন ভক্তদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জের একাধিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। রোববার (২৪ নভেম্বর) নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানান।
প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, “মুক্তিধাম আশ্রম ও লালন একাডেমির আয়োজনে গত ২২ ও ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে স্থানীয় কতিপয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মেলা আয়োজনে বাধা দানের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন মেলা আয়োজনের অনুমতি না দিয়ে অসাধু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে আপস করে। বিগত দশ বছর ধরে পালন করে আসা এ মেলায় কুষ্টিয়া সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু ও লালন ভক্তরা অংশ নেন। বহু ধর্ম বহু মত-পথ এবং বহু জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলনে গড়ে উঠেছে আমাদের সংস্কৃতি। ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে বহু মত-পথকে, বহুত্ববাদকে ধারণ করে বৈষম্যে বিরুদ্ধে যে প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের এই অবস্থা তার বিরুদ্ধে। আমরা প্রশাসনের এই ন্যাক্কারজনক ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানাই।”