বিদ্রোহীদের মূল অভিযোগ ছিল, সৌদি সমাজ ক্রমশ পশ্চিমা সংস্কৃতি, ভোগবাদ এবং রাজনৈতিক আপসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
তাদের মতে, রাষ্ট্র ইসলামের প্রকৃত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তবে তাদের এই ব্যাখ্যা সৌদি আরবের আলেম সমাজসহ অধিকাংশ মুসলিম চিন্তাবিদ প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ ইসলামের পবিত্রতম স্থানে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ, মুসল্লিদের জিম্মি করা এবং রক্তপাত ঘটানো ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়।
বিদ্রোহীরা শুধু মসজিদের চত্বর নয়, এর মিনার, ছাদ এবং ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলোও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও পানি আগে থেকেই মজুত করেছিল। ফলে অভিযান শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়।
সৌদি সরকারের সামনে তখন একটি জটিল বাস্তবতা উপস্থিত হয়। একদিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অন্যদিকে ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থানের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা।
মসজিদুল হারামের ভেতরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত। এ কারণে সৌদি সরকার প্রথমে শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে। পরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের বৈধতা দিয়ে ফতোয়া জারি করা হয়।
অভিযানের প্রথম পর্যায়ে সৌদি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। মসজিদের উঁচু মিনারগুলোতে অবস্থান নেওয়া স্নাইপাররা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালাতে থাকে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও কক্ষগুলো বিদ্রোহীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। ফলে সাধারণ সামরিক কৌশল কার্যকর হচ্ছিল না।
সংকট দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা গ্রহণ করে। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ফরাসি বিশেষ বাহিনীর প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং পাকিস্তানি সামরিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে মসজিদের বিভিন্ন অংশ পুনর্দখল শুরু হয়।
অবরোধের সময় মসজিদুল হারামের ভেতরে ভয়াবহ সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। গোলাগুলি, বিস্ফোরণ এবং সামরিক অভিযানে বহু মানুষ নিহত হন। দীর্ঘ ১৪ দিন ধরে চলা অভিযানের পর ১৯৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সৌদি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সৌদি সরকারি হিসাব অনুযায়ী কয়েক শত মানুষ নিহত হয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কিছু গবেষণা ও সাংবাদিক অনুসন্ধানে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, বিদ্রোহী এবং সাধারণ মুসল্লি সবাই ছিলেন।
অভিযানের সময় বিদ্রোহীদের ঘোষিত মাহদি মুহাম্মদ আল-কাহতানি নিহত হন। জুহাইমান আল-উতাইবিসহ বহু বিদ্রোহী জীবিত আটক হয়। পরবর্তীতে বিশেষ আদালতে বিচার শেষে ১৯৮০ সালের ৯ জানুয়ারি সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ৬৩ জন বিদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কাবা অবরোধের পর সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বৃদ্ধি পায়, সামাজিক জীবনে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং রাষ্ট্র ধর্মীয় বৈধতার প্রশ্নে আরও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে।
গবেষকদের মতে, পরবর্তী কয়েক দশকে সৌদি সমাজের যে রক্ষণশীল রূপ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে, তার পেছনে ১৯৭৯ সালের এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অবরোধ চলাকালে অনেক দেশে বিভ্রান্তিকর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিছু অঞ্চলে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিক্ষোভ এবং সহিংস ঘটনাও ঘটে। ফলে ঘটনাটি শুধু সৌদি আরবের সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বৈশ্বিক মুসলিম জনমত ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
আজও ১৯৭৯ সালের কাবা অবরোধকে আধুনিক ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এটি ছিল এমন এক বিদ্রোহ, যা ইসলামের পবিত্রতম স্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিল এবং যার অভিঘাত সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় নীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা কাঠামো এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর