কলকাতার ব্যস্ততম ও অন্যতম প্রধান সড়ক রেড রোড। ১৯১৯ সাল থেকে, অর্থাৎ দীর্ঘ ১০৭ বছর ধরে এই সড়কে নিয়ম করে বছরের দুটি ঈদে নামাজে শামিল হতেন হাজার হাজার মুসল্লি। কলকাতার খেলাফত কমিটির আয়োজিত এই ঈদ জামাতকে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম জামাত বলে দাবি করা হয়। শুধু কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাই নয়, অগণিত পর্যটকও প্রতি বছর এই ঐতিহাসিক জামাতে অংশ নিতেন।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় বসার পরই মুসলিমদের এই ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানা হয়। নিরাপত্তার ঠুনকো অজুহাতে এবার সেখানে ঈদের নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ঈদের নামাজের কয়েক ঘণ্টার অনুমতি না মিললেও, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার রেড রোড টানা সাত দিন বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে। রোববার (২১ জুন) দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল আয়োজনে সেখানে তৈরি করা হয় সুবিশাল মঞ্চ।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শনিবার দু’দিনের রাজ্য সফরে এসে হুগলির তারকেশ্বরের অনুষ্ঠান শেষে রাতে লোকভবনে অবস্থান করেন মোদী। রোববার ভোরেই তিনি পৌঁছে যান রেড রোডে। সেখানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে নিজে যোগব্যায়াম করেন। মঞ্চে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর আর এন রবি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যে সড়ক দিয়ে বিধানসভা, কলকাতা হাইকোর্ট, রাজভবন ও ধর্মতলার মতো ব্যস্ততম এলাকার যোগাযোগ রক্ষা হয়, তা যোগ দিবসের নামে দিনের পর দিন বন্ধ রাখায় জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও প্রশাসনের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না।
রেড রোডে ঈদের নামাজ নিষিদ্ধ বনাম সাত দিন রাস্তা আটকে যোগ দিবস উদযাপনের এই বৈষম্যমূলক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর থেকেই নেটদুনিয়ায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। নেটিজেন ও অধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, "যেখানে শত বছরের পুরনো মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসবের জন্য মাত্র কয়েক ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ রাখার অনুমতি মেলে না, সেখানে একটি বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সাত দিন প্রধান সড়ক আটকে রাখা কোন ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা? এরই নাম কি মোদির 'সবকা সাথ, সবকা বিকাশ'?"
অধিকারকর্মীরা আরও বলছেন, এটি কেবল একটি রাস্তা বন্ধের বিষয় নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার হরণ এবং তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার একটি কুৎসিত মহড়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সংখ্যালঘুদের মনে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের নামাজ বন্ধের সিদ্ধান্তকে তথাকথিত সুশীল সমাজের কেউ কেউ সাধুবাদ জানালেও, যোগ দিবসের এই অতি-আড়ম্বর এবং ক্ষমতার আস্ফালন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বর্তমান ভারতে আইন ও নিয়ম কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর প্রয়োগের জন্যই তৈরি হয়।
দীর্ঘকাল ধর্মীয় সম্প্রীতির চাদরে ঢাকা কলকাতার বুকে বিজেপির এই নগ্ন দ্বিচারিতাকে ভারতের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর গালে এক বড় চপেটাঘাত হিসেবেই দেখছেন সচেতন বিশ্ববাসী।