শ্রমবাজারের টেকসই রূপান্তর ও অভিবাসী কল্যাণঃ
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক প্রায় ৮ থেকে ১০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যা আমাদের জাতীয় রেমিট্যান্স প্রবাহের অন্যতম মূল স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজারের পরিধি আরও সম্প্রসারণ এবং নতুন করে বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার (Top Priority) পাচ্ছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সংখ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে 'সিটিজেন টু সিটিজেন' (C2C) আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ যাতে সম্পূর্ণ বৈধ, নিরাপদ ও সহজতম প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে (Formal Channels) দেশে পাঠানো যায়, সেই লক্ষ্যে ফিনটেক ও ব্যাংকিং সেবার আধুনিকায়ন এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।
বাণিজ্য ভারসাম্য, এফটিএ (FTA) এবং নতুন অর্থনৈতিক করিডোরঃ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (১২.১৮ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত) পৌঁছেছে। তবে এই বাণিজ্যে মালয়েশিয়ার অনুকূলে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, কারণ তাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলো পেট্রোলিয়াম সামগ্রী। বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি করে থাকে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে এই সফরে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement - FTA) স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে 'টার্মস অব রেফারেন্স' (Terms of Reference) বিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল ইকোনমি (Halal Economy), জ্বালানি নিরাপত্তা ও আধুনিক কৃষিক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগের নতুন পথ উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
আসিয়ান (ASEAN) ও আরসিইপি (RCEP): আঞ্চলিক সংযোগের নতুন সমীকরণঃ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও রাজনৈতিক জোট 'আসিয়ান' (ASEAN)-এর অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য মালয়েশিয়া। আসিয়ানে বাংলাদেশের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' (Sectoral Dialogue Partner) হিসেবে অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য ব্লক 'আরসিইপি' (RCEP)-এ যোগদানের জন্য বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, এই সফরে মালয়েশিয়ার জোরালো সমর্থন আদায় করা আমাদের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য। আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সংযোগ দৃঢ় করতে পারলে তা বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে।
জ্ঞানভিত্তিক অংশীদারিত্ব ও উচ্চশিক্ষা কূটনীতিঃ
ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চমৎকার মেলবন্ধনে মালয়েশিয়া বৈশ্বিক শিক্ষাঙ্গনে একটি অনন্য হাবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অন্তত ১১,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে, যা দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উৎসের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম। শিক্ষা খাতে এই অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ একাডেমিক প্রোগ্রাম (Joint Degree) চালুর বিষয়ে এই সফরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সফরে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের মানুষের মধ্যকার আত্মিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।
বহুপাক্ষিক ফোরাম ও মুসলিম বিশ্বের সংহতিঃ
মুসলিম বিশ্বের দুটি প্রগতিশীল ও উন্নয়নকামী রাষ্ট্র হিসেবে ওআইসি (OIC), জাতিসংঘ এবং কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার অবস্থান অভিন্ন ও অত্যন্ত জোরালো। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই মালয়েশিয়া মানবিক ও কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে এবং কাউন্টার-টেররিজম রিসার্চসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় দুই দেশের গোয়েন্দা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির বিষয়েও এই সফরে কার্যকর অগ্রগতি আশা করা যায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মালয়েশিয়া সফর কেবল একটি প্রথাগত দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভূ-অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং বহুমাত্রিক কূটনীতির এক নতুন জয়যাত্রা। কুয়ালালামপুরের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী চীনের ডালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন, যা তাঁর এই সফরের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শ্রমবাজারের শৃঙ্খলা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সূচনা এবং আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার মাধ্যমে এই সফর দীর্ঘমেয়াদে 'সবার আগে বাংলাদেশ' বিনির্মাণের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে—এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।
লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।