calendar_today সোমবার, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ
ব্রেকিং নিউজ
কুরআন প্রতিযোগিতার বিশ্বমঞ্চে জাকারিয়াপ্রথম বাংলাদেশি , আনন্দে মাতোয়ারা তার গ্রাম ◆ সরকার উৎখাতের চেষ্টায় কী পেল আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে সাত দশকের ? ◆ ইউনূস আমলের ১৮ মাস: উঠেছে যেসব গুরুতর আইনি প্রশ্ন ◆ আধুনিক ও সবুজ ঢাকা গড়তে একসঙ্গে কাজ করবে এবিজি-ডিএনসিসি ◆ আইসিসিবিতে সেপ্টেম্বর থেকে ‘সুপার সেল কার বাজার’ ◆ মরিনহোর জাদুতে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় কোর্তোয়া ◆ ​শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি: সততা ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত ◆ ব্যাংক খাত সংস্কার ও পুনঃমূলধনীকরণের উদ্যোগ ‎এডিবির সহায়তায় ◆ সালাহউদ্দিন আহমেদ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ◆ নিঝুম দ্বীপের বালির ২৫ শতাংশই ভারী খনিজ ◆ এবার জেন আলফার আন্দোলনে উত্তাল ভারত,জেন জি’র পর ◆ ফ্যাসিস্ট’ তকমার আড়ালে কি চাপা পড়ছে ইতিহাসের প্রশ্ন?
home হোম / জাতীয় / ‘পূর্ব পাকিস্তানের মাটি সবুজ থেকে লালে রাঙাতে হবে’—একটি উক্তি, এক ইতিহাস, এক শিক্ষা
stars বিশেষ প্রতিবেদন এক্সক্লুসিভ
জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন

‘পূর্ব পাকিস্তানের মাটি সবুজ থেকে লালে রাঙাতে হবে’—একটি উক্তি, এক ইতিহাস, এক শিক্ষা

ইতিহাসে কিছু কিছু বাক্য কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; সেগুলো একটি সময়, একটি মানসিকতা এবং একটি জাতির স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল ফরমান আলীর নামে প্রচলিত উক্তি—‘পূর্ব পাকিস্তানের জমিনের সবুজকে লালে...

person
বাংলার ডাক verified
Staff reporter
schedule প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ • দুপুর ০২:৩০
history আপডেট: ৩ মাস আগে
timer ১৬ মিনিট পড়ার সময়
visibility ১৪১ বার পঠিত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল শুধু একটি যুদ্ধের বছর নয়; এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়েরও নাম। বাংলার সবুজ ভূখণ্ড সত্যিই রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। সেই রক্ত ছিল ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক কর্মী এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষের। একটি গণতান্ত্রিক রায়কে অস্বীকার করার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ঠেলে দেয়।


১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। গণতান্ত্রিক রীতিতে সেই ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ পরিত্যাগ করে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সংকটের দিকে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।


অভিযানের শুরু থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ছিল সেই বর্বর অভিযানের অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পুলিশ সদস্য, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিক নির্বিচারে প্রাণ হারান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রাম ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা ও ব্যাপক নির্যাতনের ফলে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হন।


এই দমন-পীড়নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একা ছিল না। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল রাজাকার, আলবদর ও আল-শামস বাহিনী। বিভিন্ন গবেষণা, দলিল ও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু ব্যক্তি এসব বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সামরিক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের এই সমন্বিত ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।


সহযোগী বাহিনীগুলো শুধু সামরিক সহায়তাই দেয়নি; তারা স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ, স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে শনাক্ত করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার কাজেও ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা ইতিহাসে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও চিন্তাবিদদের হত্যা ছিল সদ্য জন্ম নিতে যাওয়া একটি রাষ্ট্রের মেধাভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত প্রয়াস।


বাংলাদেশের মানুষের কাছে ১৯৭১ কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি, আত্মত্যাগ ও পরিচয়ের অংশ। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি জাতিকে কত বড় মূল্য দিতে হয়েছিল।


তবে মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাবলিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এমন এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, যেখানে মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দাবি করেছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধ ছিল যেমন জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, তেমনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারও সংগ্রাম।


এই কারণেই স্বাধীনতার চেতনা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা জনগণের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—এই নীতিই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা।


কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রাপথ সব সময় এই আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সীমিত করা, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং জবাবদিহি সংকুচিত করার অভিযোগের মুখে পড়েছে।


স্বাধীনতা সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেই কোনো রাজনৈতিক দল চিরদিন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। সমালোচকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মেয়াদে বিরোধী রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয়েছে, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


এসব সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এসব প্রশ্নের ভিত্তি হলো—যে মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই মূল্যবোধ যেন প্রতিটি সরকারের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার অধিকার দেয়নি; বরং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে।


এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ইতিহাসের অন্যান্য গণআন্দোলনের মতো এটিকেও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছে এবং এতে নিজেদের অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, কোনো গণআন্দোলনের একক মালিকানা কোনো রাজনৈতিক দল দাবি করতে পারে না।


একটি গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি থাকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে—শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, পরিবার, পেশাজীবী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের সম্মিলিত প্রত্যাশায়। তাই জুলাইয়ের ঘটনাবলির মূল্যায়নও কেবল রাজনৈতিক কৃতিত্বের হিসাব দিয়ে নয়; বরং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়েছে কি না, নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়েছে কি না, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিস্তৃত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত থাকবে।


বাংলাদেশের ইতিহাসে যেসব রাজনৈতিক শক্তি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের ভূমিকা স্মরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ এগোতে পারে না। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, গণতন্ত্রের ভিত্তি কেবল অতীতের বিচার নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা।


বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করার উপায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরস্থায়ীভাবে বর্জন করা নয়; বরং এমন একটি আত্মবিশ্বাসী গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে মতভিন্নতাকে শত্রুতা নয়, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে।


বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক ধরনের বৈপরীত্যও রয়েছে। যে জাতি কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতিকেই পরবর্তী সময়ে বারবার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়েছে। যে আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী রাজনৈতিক শক্তিকেও কখনো কখনো একই অধিকার সীমিত করার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে।


এটাই সম্ভবত রাষ্ট্র নির্মাণের চিরন্তন বাস্তবতা। স্বাধীনতা কোনো যাত্রার শেষ নয়; বরং প্রতিটি প্রজন্মের সামনে নতুন দায়িত্ব। প্রতিটি প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোকে ধারণ করবে, নাকি সেগুলো থেকে বিচ্যুত হবে।


ফরমান আলীর নামে প্রচলিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজকে লালে রাঙাতে হবে’ উক্তিটি নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। সেই শিক্ষা হলো—যখন একটি সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে অস্বীকার করে এবং সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগকে বেছে নেয়, তখন রাষ্ট্র ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যায়।


বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কখনোই সেই পথে হাঁটা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের আধিপত্যে নয়; বরং সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য জনগণকে নীরব করা নয়, তাদের সেবা করা।


বাংলার সবুজ ভূমি এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের। সেই সবুজকে রক্ষা করার দায়িত্বও সবার। অতীতের আত্মত্যাগ স্মরণ করার পাশাপাশি প্রতিদিন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও জবাবদিহির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই হবে ১৯৭১ সালের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। কারণ তাঁরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশ কেবল স্বাধীন ভূখণ্ড নয়; এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের অধিকারই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।