calendar_today সোমবার, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ
ব্রেকিং নিউজ
কুরআন প্রতিযোগিতার বিশ্বমঞ্চে জাকারিয়াপ্রথম বাংলাদেশি , আনন্দে মাতোয়ারা তার গ্রাম ◆ সরকার উৎখাতের চেষ্টায় কী পেল আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে সাত দশকের ? ◆ ইউনূস আমলের ১৮ মাস: উঠেছে যেসব গুরুতর আইনি প্রশ্ন ◆ আধুনিক ও সবুজ ঢাকা গড়তে একসঙ্গে কাজ করবে এবিজি-ডিএনসিসি ◆ আইসিসিবিতে সেপ্টেম্বর থেকে ‘সুপার সেল কার বাজার’ ◆ মরিনহোর জাদুতে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় কোর্তোয়া ◆ ​শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি: সততা ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত ◆ ব্যাংক খাত সংস্কার ও পুনঃমূলধনীকরণের উদ্যোগ ‎এডিবির সহায়তায় ◆ সালাহউদ্দিন আহমেদ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ◆ নিঝুম দ্বীপের বালির ২৫ শতাংশই ভারী খনিজ ◆ এবার জেন আলফার আন্দোলনে উত্তাল ভারত,জেন জি’র পর ◆ ফ্যাসিস্ট’ তকমার আড়ালে কি চাপা পড়ছে ইতিহাসের প্রশ্ন?
home হোম / জাতীয় / কওমি মাদ্রাসার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
stars বিশেষ প্রতিবেদন এক্সক্লুসিভ
জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন

কওমি মাদ্রাসার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাজির করেছে—কওমি মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? প্রায় ছয় মিনিটের ওই ভিডিওতে এক শিক্ষককে কয়েকজন...

person
বিশেষ প্রতিনিধি verified
Reporter
schedule প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬ • বিকাল ০৪:৩৪
history আপডেট: ২ মাস আগে
timer ১২ মিনিট পড়ার সময়
visibility ১১৩ বার পঠিত
শিশু নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে কঠিন জায়গা। একটি শিশু যখন পরিবারের কাছ থেকে দূরে কোনো আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকে, তখন তার ওপর নির্যাতন হলে সে সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না। অনেক সময় সে জানেই না, তার সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। কখনো ভয় দেখানো হয়, কখনো প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার ভয় থাকে, আবার কখনো সামাজিক লজ্জা ও পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় শিশুটি মুখ বন্ধ রাখে।

অভিভাবকরাও অনেক সময় অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বললে সামাজিকভাবে সমালোচিত হওয়ার ভয় থাকে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

ফলে গণমাধ্যমে যে সংখ্যক ঘটনা প্রকাশ পায়, প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির বিষয়টিও কম উদ্বেগের নয়। বেত দিয়ে পেটানো, মারধর, আটকে রাখা কিংবা অপমানজনক আচরণের খবর প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ২০১১ সালে হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে পরিপত্র জারি করেছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, কওমি মাদ্রাসায় এই নির্দেশনা কতটা কার্যকর?

শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সরকারি স্কুল, বেসরকারি স্কুল, ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান কিংবা কওমি মাদ্রাসা—প্রতিষ্ঠানের ধরন যাই হোক, সেখানে পড়া প্রতিটি শিশুর অধিকার সমান।

কওমি মাদ্রাসা সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হয় না কিংবা ঐতিহ্যগতভাবে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে—এই যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্র শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। কারণ শিশুটি তো রাষ্ট্রেরই নাগরিক। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ। শিশুদের সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা, নির্যাতন ও অবহেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবেও দিয়েছে। ফলে কোনো শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিচয় কিংবা পরিচালন কাঠামো কোনো বাধা হতে পারে না।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—কওমি মাদ্রাসা মানেই নির্যাতনের জায়গা, এমন ধারণা যেমন সত্য নয়, তেমনি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো ব্যবস্থার সমস্যাকে অস্বীকার করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁদের অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, সেসব ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনোভাবেই পুরো কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপানো উচিত নয়। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধীকে দায়মুক্ত রাখার সুযোগও থাকা উচিত নয়।

এখন সময় এসেছে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কাঠামো গড়ে তোলার।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো ধরনের সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আপসের মাধ্যমে গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক কীভাবে শিশুকে শাসন করবেন, কীভাবে শিশুর মানসিক বিকাশ বুঝবেন, কীভাবে সহিংসতা ছাড়া শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব আরও সক্রিয়ভাবে পালন করতে হবে। শুধু পরীক্ষা নেওয়া বা শিক্ষাক্রম পরিচালনা নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাদের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। শিশু নির্যাতনের অভিযোগে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী দোষী সাব্যস্ত হলে ভবিষ্যতে তিনি যেন অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের দায়িত্বে যেতে না পারেন, সে জন্য আইনসম্মত ও যথাযথ তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রতি সহিংসতাকে ‘শাসন’ বলে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

ধর্মীয় শিক্ষা শিশুকে মানবিক হতে শেখায়। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি কোমলতা, মমতা ও ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়। শিশুদের গায়ে হাত তোলা, অপমান করা কিংবা ভয় দেখিয়ে শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই।

বরং যে শিক্ষা একটি শিশুকে ভীত, আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, সেই শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

অভিভাবকেরা সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান মানুষ হওয়ার জন্য। তাঁরা চান সন্তান জ্ঞান অর্জন করুক, নৈতিকতা শিখুক, ধর্মীয় মূল্যবোধে বেড়ে উঠুক। কোনো বাবা-মা চান না, তাদের সন্তান কোনো শিক্ষকের নির্যাতনের শিকার হোক কিংবা নিথর দেহ হয়ে ঘরে ফিরুক।

তাই প্রশ্নটি কেবল কওমি মাদ্রাসার নয়। প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রের, আমাদের সমাজের এবং আমাদের বিবেকের।

একটি শিশু স্কুলে পড়ুক কিংবা মাদ্রাসায়—তার অধিকার সমান। সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হোক কিংবা সচ্ছল পরিবারের, এতিম হোক কিংবা অভিভাবকসহ বেড়ে উঠুক—তার নিরাপত্তার অধিকারও সমান।

কওমি মাদ্রাসার শিশুরাও এই দেশের সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

সুতরাং কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সাময়িক উত্তেজনা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা। প্রয়োজন কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা বোর্ড, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, অভিভাবক, শিশু অধিকারকর্মী এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

কারণ একটি শিশুর কান্না কখনোই কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে ছোট হতে পারে না। একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো আপসের বিষয় হতে পারে না। আর যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সাফল্যের কোনো দাবিই পূর্ণতা পায় না।