calendar_today সোমবার, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ • ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ দৈনিক বাংলার ডাক - শীর্ষ বাংলা অনলাইন পত্রিকা ও ব্রেকিং নিউজ
ব্রেকিং নিউজ
কুরআন প্রতিযোগিতার বিশ্বমঞ্চে জাকারিয়াপ্রথম বাংলাদেশি , আনন্দে মাতোয়ারা তার গ্রাম ◆ সরকার উৎখাতের চেষ্টায় কী পেল আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে সাত দশকের ? ◆ ইউনূস আমলের ১৮ মাস: উঠেছে যেসব গুরুতর আইনি প্রশ্ন ◆ আধুনিক ও সবুজ ঢাকা গড়তে একসঙ্গে কাজ করবে এবিজি-ডিএনসিসি ◆ আইসিসিবিতে সেপ্টেম্বর থেকে ‘সুপার সেল কার বাজার’ ◆ মরিনহোর জাদুতে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় কোর্তোয়া ◆ ​শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি: সততা ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত ◆ ব্যাংক খাত সংস্কার ও পুনঃমূলধনীকরণের উদ্যোগ ‎এডিবির সহায়তায় ◆ সালাহউদ্দিন আহমেদ এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ◆ নিঝুম দ্বীপের বালির ২৫ শতাংশই ভারী খনিজ ◆ এবার জেন আলফার আন্দোলনে উত্তাল ভারত,জেন জি’র পর ◆ ফ্যাসিস্ট’ তকমার আড়ালে কি চাপা পড়ছে ইতিহাসের প্রশ্ন?
home হোম / জাতীয় / দুর্নীতির পুরোনো জালে আটকে গেল জুলাইয়ের স্বপ্ন
stars বিশেষ প্রতিবেদন এক্সক্লুসিভ
জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন

দুর্নীতির পুরোনো জালে আটকে গেল জুলাইয়ের স্বপ্ন

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সরকারি সেবায় দুর্নীতি, ঘুষ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ কমেনি।...

person
বিশেষ প্রতিনিধি verified
Reporter
schedule প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬ • দুপুর ০২:৪৮
history আপডেট: ২ মাস আগে
timer ১২ মিনিট পড়ার সময়
visibility ৬৬ বার পঠিত

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় পার করা নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক অনাস্থার জায়গা থেকে রাষ্ট্রকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।


কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতির কাঠামো সহজে বদলায়নি। বরং বিভিন্ন জরিপ ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও ঘুষের প্রবণতা অব্যাহত ছিল।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড সার্ভে ২০২৫’ সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় এই পরিমাণ বেড়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।


জরিপে দেখা যায়, অন্তত একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার। এর আগে এই হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালে এ হার ছিল ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।


দুর্নীতির শিকার হলেও অনেক মানুষ অভিযোগ করেননি। জরিপ অনুযায়ী, ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ অভিযোগ করার প্রয়োজন মনে করেননি। তাদের ধারণা ছিল, প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরেই দুর্নীতি এতটা বিস্তৃত যে অভিযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।


টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে পাসপোর্ট সেবা, বিচার বিভাগীয় সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি প্রশাসন খাতে।


টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঘুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তাঁর মতে, সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করে ঘুষ দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের মানুষ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।


বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল—যে প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই কাঠামোর ভেতরেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি।


রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দুর্নীতির সংস্কৃতি বহাল থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যেও। নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। তাঁর মন্তব্য ছিল, যারা আগে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা এখনও বিভিন্নভাবে সেই পথ খুঁজে নিচ্ছে।


মির্জা ফখরুলের এই মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কি রাষ্ট্রের ভেতরের সংস্কৃতিও বদলায়, নাকি পুরোনো কাঠামো নতুন বাস্তবতায়ও টিকে থাকে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার সাধারণত একটি বিদ্যমান আমলাতন্ত্র উত্তরাধিকার হিসেবে পায়। তবে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করে সেই কাঠামোর মধ্যে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে তার ওপর।


জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়েও প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ তারা প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে থেকে নতুন ধরনের জবাবদিহিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়।


টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, ছাত্র উপদেষ্টারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাদের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ঘিরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।


সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে প্রকল্প বরাদ্দ, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে তিনি এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন।


অন্যদিকে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সময় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের গতি নিয়েও সমালোচনা হয়। সাংবাদিক সুরক্ষা আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন কমিশনের সংশ্লিষ্টরা।


রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যে ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর মতে, ছাত্র প্রতিনিধিরা অনেক ক্ষেত্রে রূপান্তরমূলক সংস্কারকের পরিবর্তে প্রচলিত প্রশাসকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ ছিলেন।


বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের আন্দোলন মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়োগ, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই দুর্বল করেছে।


তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকদের যুক্তি, তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পেয়েছিল যেখানে দুর্নীতির শিকড় বহু বছরের পুরোনো এবং গভীর। তাই অল্প সময়ে পুরো কাঠামো পরিবর্তন করা সহজ ছিল না।


তবু তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্যই সরকারের মূল্যায়নের প্রধান জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


বর্তমান সরকারের জন্যও এই পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ তাদের সামনে রয়েছে এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যেখানে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভ্যাস পরিবর্তন করা সহজ নয়। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।


এ অবস্থায় টিআইবির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, সমন্বিত দুর্নীতিবিরোধী নীতি গ্রহণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।


বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আরও কঠিন। গণআন্দোলনের শক্তিকে টেকসই সংস্কারে রূপ দিতে না পারলে জনগণের আস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারকে মূল্যায়ন করা হবে শুধু তাদের ঘোষিত লক্ষ্য দিয়ে নয়, বরং তারা যে পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছিল সেটি কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে তার ভিত্তিতে। এখন দায়িত্ব বর্তমান সরকারের—রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সত্যিকার অর্থে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়া। অন্যথায় ক্ষতি হবে শুধু কোনো একটি সরকারের নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস।