প্রযুক্তিকে এড়িয়ে গিয়ে কিংবা উপেক্ষা করে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশের মধ্য দিয়েই সভ্যতার উন্নয়ন ও বিকাশ সাধিত হয়েছে। এই ধারা সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত বহমান। আমরা যদি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চাই, উন্নতি ও সমৃদ্ধি চাই, তবে একালের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই এ যুগের বিস্ময়। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, উন্নয়নশীল বিশ্বেও, এমনকি তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত হচ্ছে। এআই এর আরো উন্নয়ন, প্রসার, পারস্পরিক সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ইত্যাদির জন্য বিশ্বে ইতোমধ্যে এআই জোট গড়ে উঠেছে। ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ এমনই একটি জোট। চীনের উদ্যোগে এ জোট গড়ে উঠেছে। রাশিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিলসহ ২৯টি দেশ রয়েছে এ জোটে। উদ্ভাবনের ওপর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার, ডিজিটাল বিভাজন হ্রাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের প্রচার ইত্যাদি লক্ষ্য নিয়ে এ জোট গঠিত হয়েছে। বলে রাখা দরকার, চীন এআই প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ। বাংলাদেশ চীনের নেতৃত্বাধীন এই এআই জোটে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা অত্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দেশের মানুষ চায়, জোটে পূর্ণ সদস্য হোক বাংলাদেশ। স্মরণ করা যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় যেসব ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে রাজি হয়েছে, তার মধ্যে এআই ক্ষেত্রে সহযোগিতা অন্যতম। শুধু এআই নয়, বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন আছে, এমন সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিতে চীন সম্মত হয়েছে। চীনের এই ব্লাংক চেক আমরা কতটা কাজে লাগাচ্ছি, সেটাই প্রশ্ন। চীনের প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরে সম্মতি দিতে এত বিলম্ব হচ্ছে কেন, অনেকের মনেই সেই প্রশ্ন। তিস্তা মহাপ্রকল্প গ্রহণে চূড়ান্ত সিদ্ধন্ত নিতে বিলম্ব দেশের মানুষ পছন্দ করছে না। সকলেই চায়, চীনা সহযোগিতার প্রস্তাব ও আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। এআই-সহ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা একান্তভাবেই কাম্য।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিকসহ জীবনের কোনো দিক-বিভাগেরই কাক্সিক্ষত উন্নয়ন-সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। আর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রধান শর্তই হলো ইন্টারনেটের উচ্চগতি নিশ্চিত করা, ডিজিটাল অবকাঠামো বৃদ্ধি করা এবং ডিভাইস, ডেটা প্যাকেজের দাম কমানো। আরব আমিরাতে যেখানে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৬৮১ এমবিপিএস এবং সিঙ্গাপুর ব্রডব্যান্ডের গতি ৪২১ এমবিপিএস, সেখানে আমাদের অবস্থান নেপাল-ভুটানেরও পেছনে। বিশ্বে যখন ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে, হাই স্পিড প্লেন, হাই স্পিড ট্রেনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে, সেখানে আমরা পড়ে আছি বলতে গেলে মান্ধাতা আমলে। তাহলে আমাদের প্রত্যাশিত জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি হবে কীভাবে? ইন্টারনেটসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তারা বিদ্যমান পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, শর্ষের মধ্যেই ভূত রয়েছে। ভূতের কারণেই এক্ষেত্রে কাম্য উন্নয়ন-অগ্রগতি হচ্ছে না। তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ক্ষমতাসীনরা অতীতের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে দুর্নীতি করেছে, লুটপাট করেছে। প্রচারে থেকেছে, কাজে চরম অবহেলা দেখিয়েছে। বর্তমান সরকারকে অতীতের ক্ষমতাসীনদের অনুসরণ করলে চলবে না। সরকারের অনেকের মধ্যে প্রচারে থাকার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের মানুষ লেকচার নয়, কাজ দেখতে চায়। আমরা আশা করবো, দেশকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।