কিন্তু সমস্যা হলো, বাণিজ্যমন্ত্রী এক ধরনের হোর্ডিং বা মজুদদারির মাধ্যমে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এ হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে রাজি নন। সংসদের ওই একই ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘লক্ষ্য রাখা দরকার, (সিন্ডিকেটের হোতাদের) জেলে ভরলাম, জরিমানা করলাম। সেটা হয়তো করা সম্ভব। কিন্তু তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে, সেটা সইতে তো আমাদের কষ্ট হবে।’ অর্থাৎ বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন, দুষ্ট লোকেদের শাস্তি দিলে তারা আরও দুষ্টামি করবে; অতএব মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে বাবা-সোনা ডেকে যতটুকু পারা যায় তাদের বোঝাতে হবে। কিন্তু চোর কি ধর্মের কাহিনী শোনে? আর মুনাফালিপ্সু ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা যদি এতটাই ভদ্র হতো তাহলে দেশে মজুদদারি নিরোধে আইন করা হয়ছে কেন? মনে রাখতে হবে, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে এ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গত ২২ জুন ‘খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন, মজুদ, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন-২০২০’ নামক যে বিলটি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে তাতেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বাইরে খাদ্যদ্রব্য মজুদের জন্য ১৪ বছরের সাজা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীকেও একাধিকবার এ আইনের প্রসঙ্গ টেনে মজুদদারদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করতে শুনেছি। প্রধানমন্ত্রীর এসব হুশিয়ারি কি তাহলে নিছক কথার কথা?
বাণিজ্যমন্ত্রী যে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর উপায় বাতলেছেন, তা কিন্তু এরই মধ্যে নিস্ফল প্রমাণিত হয়েছে। প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব মেনে তেল, চিনিসহ বেশ কিচু পণ্যের ওপর থেকে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হলো; কিন্তু এর কোনো প্রভাব খুচরা বাজারে পরিলক্ষিত হয়নি। তারপর দেখা গেছে, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব মেনে সরকার ভোজ্য তেল ও চিনির খুচরা দর ঠিক করে দিল; সেটাও মান্যতা পেলো না। বলা হলো, বিশ্ববাজারে পণ্যগুলোর দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু আজকে যখন বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম ইউক্রেন যুদ্ধের আগের পর্যায়ে চলে গছে তখনও দেশের বাজারে পণ্যটির দাম সে পর্যায়ে তো যায়ইনি বরং বেশ চড়া। আর চিনি তো মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যায় বাজার থেকে; তখনও সরকারকে ওই তোতা পাখির বুলি-মজুদ যথেষ্ট আছে-আওড়ানো ছাড়া কিছুই করতে দেখা যায় না।
কয়েক মাস আগে বাজার থেকে যখন স্পষ্টত আমদানিকারকদের ইচ্ছায় ভোজ্য তেল উধাও হয়ে গেল তখন ভোক্তা অধিদপ্তরকে কয়েকটি তেল কারখানায় অভিযান চালাতে দেখা গেল। কিন্তু সেটা কোনো ফলই তৈরি করতে পারল না। দেখা গেল, কোনো কোনো কারখানায় দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া গেল না তাই ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানকারীরা কতটুকু আমদানি হয়েছে কতটুকু বাজারে ছাড়া হয়েছে তার সঠিক হিসেব পেল না; আবার কোথাও তাদের ঢুকতেই দেওয়া হলো না। কিন্তু আইনও সেখানে কোনো কথা বলল না।
সম্ভবত এ অভিজ্ঞতা থেকেই সাম্প্রতিক চিনি সংকটে ভোক্তা অধিদপ্তর কোনো অভিযানই চালাল না। ফলে ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে যাও কিছু হৈচৈ হলো চিনির ক্ষেত্রে তাও হলো না। বড় ব্যবসায়ীদের তৈরি বাজার সিন্ডিকেটই শেষ হাসিটা হাসল।
কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক হিসেবে সরকার সংবিধান ও শপথের কারণে নাগরিকদের স্বার্থ দেখতে বাধ্য। তাই ভোগ্যপণ্যের বাজার সে কতিপয় ব্যবসায়ীর হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। তবে এটাও সত্য, নাগরিকদের মধ্য থেকে চাপ তৈরি না হলে সরাকারের এ নিরবতা ভাঙবে না।