দালাল ছাড়া কাজ সারতে গেলেই গ্রাহকের অভিজ্ঞতা হয় উল্টো। গ্রাহক নিজে গেলেও কাগজপত্র ত্রুটির অভিযোগ তুলে ঘুষ দাবি করেন বিআরটিএ অফিসের পরিদর্শক, অফিস সহকারী কিংবা সংশ্লিষ্ট শাখার মৌখিক নিয়োগে কর্মরত কর্মীরা (গেটিস)। টাকা না দিলেই বাড়ে হয়রানি। কাজভেদে গুনতে হয় ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। বড় কর্তারা গ্রাহকের কাছে সরাসরি টাকা দাবি না করলেও ঘুষের ভাগ ঠিকই পৌঁছে যায় তাদের পকেটে। সমকালের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘অন্ধের মতো’ ফিটনেস সনদ গাড়ি যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত কিংবা রাস্তায় চলার উপযুক্ত কিনা– তা যাচাই করে যানবাহনের ফিটনেস দেওয়ার নিয়ম। দেখা গেছে, ফিটনেস যাচাইয়ের জন্য বেশির ভাগ গাড়িই বিআরটিএ কার্যালয়ে হাজির করতে হয় না। টাকা পকেটে পুরে ‘অন্ধের মতো’ দেদার দেওয়া হচ্ছে ফিটনেস সনদ। এ প্রক্রিয়ায় ত্রুটিযুক্ত গাড়িও পেরিয়ে যাচ্ছে ফিটনেসের বাধা। গত ৩০ মে ঢাকা মেট্রো-গ-২৯-৮৯৭৬, ঢাকা মেট্রো-গ-৩৬-৬৭০২, ঢাকা মেট্রো-গ-১৭-০৪৯৯ নম্বরের প্রাইভেটকার এবং ঢাকা মেট্রো-চ-২০-৪১২৬ নম্বরের মাইক্রোবাস ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এ (মিরপুর কার্যালয়) হাজির করা হয়নি। অথচ মোটরযান পরিদর্শক সাবরুজ্জামান দুলাল ওই দিনই গাড়িগুলোর ফিটনেস সনদ দিয়েছেন। এ সময় আরও একাধিক গাড়ির ফিটনেস না দেখেই সনদ দেওয়া হয়। প্রাইভেটকার রেজিস্ট্রেশন করতে গাড়ি হাজির করতে হয় না মিরপুর অফিসে। বিভিন্ন গাড়ির শোরুম থেকে রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত কাগজপত্রের পাশাপাশি ঘুষের টাকাও পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওই অফিসের সংশ্লিষ্ট শাখায়। কর্মকর্তাদের বাড়তি টাকা দিলে মালিকানা বদলাতেও গাড়ি কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতাকে হাজির হতে হয় না। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘গাড়ি উপস্থিত না করে ফিটনেসের যে প্রক্রিয়া, সেটি সড়কে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। ফিটনেসে গাড়ির অবকাঠামো এবং যান্ত্রিক ৩০-৩২টি আইটেম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। আনফিট গাড়ি সড়কে নামার কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার পাশাপাশি সড়কে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।’ প্রতিদিন কত সনদ গড়ে প্রতিদিন কত গাড়ির ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়, তা জানতে বিআরটিএ থেকে নেওয়া হয় এক মাসের হিসাব। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত মার্চে মিরপুর অফিস থেকে ১৩ হাজার ৬০৪টি গাড়ির ফিটনেস দেওয়া হয়। সরকারি ছুটি বাদে হিসাব করলে গড়ে প্রতিদিন দেওয়া হয় ৬৮০টি ফিটনেস সনদ। দিনে এ সংখ্যা ৫০০ থেকে ৭০০-এর মধ্যে ওঠানামা করে। তবে এর অর্ধেকের বেশি গাড়ি ফিটনেস পরীক্ষার সময় উপস্থিত থাকে না। ঢাকার এক ট্রাকমালিক জানান, ছোট-বড় কয়েকটি ট্রাক রয়েছে তাঁর। ফিটনেস সনদ নিতে কখনও তিনি বিএআরটিএতে ট্রাক পাঠান না। ফিটনেসের জন্য ট্রাক হাজির করলে একটা দিন লোকসান গুনতে হয়। তাই দালালের মাধ্যমে কাগজপত্র ও বাড়তি টাকা পাঠিয়ে দিলেই ফিটনেস সনদ পাওয়া যায়। গাড়ির ওজনভেদে ঘুষ কমবেশি হয়। মিনি ট্রাকের জন্য দেড় হাজার টাকা, তিন টনের বেশি ট্রাকের জন্য দুই হাজার টাকা। চাকরি ছেড়ে দালালিতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বিআরটিএর বিভিন্ন সার্কেলে নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরাও দালালিতে ব্যস্ত থাকেন। তারা যেন ইউনিফর্ম পরা ‘বৈধ দালাল’। কয়েকজন সাবেক আনসার সদস্য ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এর (মিরপুর কার্যালয়) কর্মকর্তাদের ‘গেটিস’ হিসেবে ছায়া হয়ে থাকেন। মালিকানা বদল শাখার নাজমুল, রেজিস্ট্রেশন শাখার মহসিন, প্রাইভেট মালিকানা শাখার মিরাজ, লাইসেন্স শাখার মিজানুর রহমান, ফিটনেস শাখার ফিরোজ ও মাহফুজ, রুট পারমিট শাখার শাহেদ আলী, নয়ন, রফিক ও খোরশেদ সাবেক আনসার সদস্য। তাঁরা সবাই একসময় মিরপুর অফিসের আনসার ছিলেন। তখনও তাঁরা দালালি করতেন। এ কাজে আয়-রোজগার বেশি হওয়ায় চাকরি ছেড়ে বিআরটিএতে স্থায়ীভাবে দালালি শুরু করেন। বিআরটিএর ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সমকালকে বলেন, সেবাগ্রহীতাদের দালালমুক্ত সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন অনলাইনে করা যায়। ঘরে বসেই সরকারি ফি পরিশোধ করা যাচ্ছে। শুধু কেন্দ্রে গিয়ে মানুষ পরীক্ষা দেবে এবং বায়োমেট্রিক সশরীরে গিয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন বা যানবাহন-সংক্রান্ত যে কোনো কাজে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা নেওয়া হয় না। তবে সমকালের অনুসন্ধানে মিরপুর অফিসে দালাল থাকার প্রমাণ মিলেছে। দালালের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা বাড়তি টাকা দিয়ে দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। দালাল কিংবা সেখানে নিরাপত্তায় থাকা আনসার সদস্যরা সেবাগ্রহীতার প্রয়োজনীয় কাজের নথি নিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখায় ঢুকছেন এ দৃশ্য গোপন নয়। আর ‘গেটিস’ যে অফিসের ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে মিলে কাজ করছেন, সেটিও প্রকাশ্যে। দালালরাই ‘রাজা’ গত ২৮ মে মোটরসাইকেলের (ঢাকা মেট্রো-হ-৫৮-০০৪৯) মালিকানা বদলের জন্য মিরপুরের বিআরটিএ অফিসে যান ক্রেতা সাইদুর রহমান ও বিক্রেতা আবদুর রহমান। সাইদুর জানান, মালিকানা বদলের জন্য অফিস চত্বরে যেতেই কয়েকজন দালাল তাঁকে ঘিরে ধরেন। পরে মালিকানা বদল করতে এক দালালের সঙ্গে সাত হাজার টাকায় রফা হয়। কাগজপত্র দালালের কাছে পাঠিয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন কার্যালয়ের নিচে। বললেন, ‘দালাল ছাড়া কাজ করতে গেলে পায়ের জুতা ক্ষয় হয়ে যাবে। এখন টাকা গেলেও কাজটা দ্রুত হবে।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল মালিকানা বদলের জন্য সরকারি খরচ ৪ হাজার ৫৭৪ টাকা। ওই দালাল নিয়েছেন বাড়তি তিন হাজার টাকা। এর মধ্যে তিনি টেবিল খরচ দিয়েছেন এক হাজার টাকা, বাকিটা তাঁর পকেটে। ২৮ মে ঢাকা মেট্রো-ল-২৪-২৯১৭ নম্বরের মোটরসাইকেলের মালিকানা বদলের জন্য ক্রেতা ইকরামের খরচ হয়েছে ৮ হাজার টাকা। তিনিও দালালের মাধ্যমে করিয়েছেন। মোটরসাইকেল বিক্রেতা উজ্জ্বল মাহমুদ বলেন, ‘বাইরে থেকে শুনি বিআরটিএ দালালমুক্ত। আসলে কর্মকর্তারাই দালাল পুষে রেখেছেন। দালাল ছাড়া কাজ করতে গেলে হয়রানি বাড়ে।’ ‘ল’ সিরিয়ালের মোটরসাইকেলের মালিকানা বদল করতে সরকারি খরচ ৫ হাজার ১৩ টাকা। প্রায় তিন হাজার অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১৬ মে মিরপুর অফিস চত্বরের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই এক যুবক ছুটে আসেন। দুলাল নামে ওই দালাল জানতে চান– কী কাজ? নিজের পরিচয় আড়াল করে প্রাইভেটকারের মালিকানা বদলের কথা বলতেই গাড়ি ও ক্রেতা-বিক্রেতা হাজির হবে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। মালিক-গাড়ি কিছুই উপস্থিত থাকবে না জানানোর পর অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা দাবি করলেন। বললেন, ‘স্যারদের বেশি টাকা দেওয়া লাগে।’ প্রশ্ন করা হয়, ৫ হাজার টাকা দিলে হবে না? উত্তরে বলেন, ‘গাড়ি হাজির করে ফাইল পাস করতেই লাগে ৫ হাজার টাকা। আপনি নিজে আমার সঙ্গে ফাইল নিয়ে যাবেন। অফিস খরচ যেখানে যা লাগে নিজ হাতে দেবেন। আমাকে দুই হাজার টাকা দিয়েন।’ কোন কোন টেবিলে ঘুষ দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বলেননি। সম্প্রতি ফয়সাল হাসান সবুজ তাঁর মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করতে আসেন মিরপুর কার্যালয়ে। বুথের সামনে লম্বা সারি। এ সুযোগে দালাল জাহিদ এসব কাগজ দ্রুত তুলে দেবেন জানিয়ে চার হাজার টাকা দাবি করেন। পরে আড়াই হাজার টাকায় রফা হলে ৩০ মিনিটে তিনি ফয়সালকে কাগজপত্র এনে দেন। মিরপুর কার্যালয়ের লাইসেন্স শাখার ‘গেটিস’ সাবেক আনসার সদস্য মিজান। তিনি একসময় মিরপুর সার্কেলের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। নবায়ন (লাইসেন্স) শাখায় ‘গেটিস’ হিসেবে আছেন আবদুল মাজেদ ও কাদের। ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার সিরিয়াল দেওয়ার নামে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেন মাজেদ। গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকার আবদুর রহিম মিরপুর অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে যান। কাগজপত্র নিয়ে তিনি দুপুর ১টার দিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স রেকর্ড রুমে (কক্ষ-১১৩) দায়িত্বে থাকা আবদুল মাজেদের কাছে জমা দিতে যান। ওই সময় তিনি বলেন, ‘আজ জমা নেওয়া যাবে না।’ পরদিন যাওয়ার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে ইশারায় কক্ষের দরজার সামনে রহিমকে অপেক্ষা করতে বলেন। পাঁচ মিনিট পর মাজেদুল ৫০০ টাকা দাবি করেন। টাকাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁর হাতে দেওয়া হয়। এই টাকা লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ সমকালের কাছে সংরক্ষিত আছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখা মিরপুর কার্যালয়ে লাইসেন্স নিতে আসা গ্রাহকের পরীক্ষা হয় জোয়ার সাহারা অফিসে। পরীক্ষা হয় সপ্তাহে পাঁচ দিন। অর্ধেকের বেশি ড্রাইভিং লাইসেন্স হয় ঘুষ প্রক্রিয়ায়। লাইসেন্স পেতে গ্রাহককে মাঠ পরীক্ষা দেওয়ার আগেই চুক্তি করতে হয় দালালের সঙ্গে। অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা, পেশাদার লাইসেন্সের জন্য দিতে হয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। অথচ সরকারি খরচ অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ৪ হাজার ৪৯৭ টাকা ও পেশাদারের জন্য ২ হাজার ৭৭২ টাকা। তবে দালাল চুক্তি করেন শিক্ষানবিশ লাইসেন্সসহ। শিক্ষানবিশের ফি ৫১৮ টাকা। দালাল গ্রাহকের রোল নম্বর পরীক্ষার আগে মোটরযান পরিদর্শকের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা করে নেন পরিদর্শক বা তাঁর প্রতিনিধি। মিরপুর অফিসের গ্রাহকের টাকা দালালরা পৌঁছে দেন জোয়ার সাহারা মেকানিক্যাল সহকারী জিয়ার কাছে। এর পর তিনি টাকা তুলে দেন মোটরযান পরিদর্শক জিয়াউর রহমানের কাছে। সপ্তাহে এক দিন টাকা ভাগাভাগি হয়। জিয়াউর রহমান নিজের অংশ রেখে বাকিটা সংশ্লিষ্ট শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেন। যা বললেন চেয়ারম্যান বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার সমকালকে বলেন, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, মালিকানা বদলের সময় যানবাহন অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সার্কেলে হাজির করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। গাড়ির ছবি তুলে রাখতে হবে। যদি গাড়ি হাজির না করে কাগজপত্র করে দেওয়া হয় তাহলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।