জানা গেছে, স্থানীয় কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রত্যেকে সাড়ে ৭ লাখ করে টাকা দিয়ে লিবিয়া পাড়ি জমান প্রতারিত হওয়া যুবকরা। লিবিয়া যাওয়ার কিছুদিন পরেই ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে অভিভাবকদের কাছে থেকে দ্বিতীয়বার টাকা আদায় করে দালালরা। এরপর সেখান থেকে মারধরের ভিডিও পাঠিয়ে যুবকদের বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এনিয়ে নেত্রকোনা মানবপাচার ট্রাইব্যুনালে গত মঙ্গলবার একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন- জেলার কলমাকান্দা উপজেলার ফাপিয়ালী গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে মো. ছাদেক (৩৬) ও মো. আব্দুল মালেক, একই এলাকার পাঁচকাটা গ্রামের মৃত টুক্কু ফকিরের ছেলে ইব্রাহিম হোসেন (৫০) ও একই গ্রামের ইটু মিয়ার ছেলে মো. জামাল মিয়া (৩৫); নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চরমান্দাইয়া মাস্টার বাড়ি গ্রামের আব্দুস ছুবাহানের ছেলে হারুন মিয়া (৪৫), সুরুজ মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (৪২) ও তার স্ত্রী হোসনে আরা (৩০), সুরুজ মিয়ার মেয়ে সাহিদা খাতুন (২৭), হিরুন মিয়া (৩৭), লাকী খাতুন (৩৭) ও রাফেজা খাতুন (৩১)।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের অভিভাবকেরা বলছেন, এক বছর ৩ মাস ধরে সন্তানদের খোঁজখবর জানার চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু তাদের কারো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এক বছর আগে দালালরা নতুন করে প্রতিজনের জন্য ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দিলে তাদের বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। নিখোঁজের পর থেকে দালালের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, তাদের পরিবারের সদস্যরাও কিছু বলছেন না।
পুলিশ ও এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ১৩ যুবক গত বছরের ২০ মার্চ দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাড়ি জমায়। নিখোঁজ যুবকরা হলেন- ওই উপজেলার ফকির-চান্দুয়াইল গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে মো. আলমগীর, হাসিম মিয়ার ছেলে সালমান মিয়া, মিরাজ আলীর ছেলে আবুল কাশেম, আব্দুল জলিলের ছেলে শাহীন মিয়া, আওয়াল মিয়ার ছেলে কালাম মিয়া, আব্দুর রশিদের ছেলে রাকিব মিয়া, আবু তাহেরের ছেলে নজরুল ইসলাম, মহর আলীর ছেলে মাসুম মিয়া, খলিল মিয়ার ছেলে আলমগীর হোসেন, আব্দুল খালেকের ছেলে সোহাগ মিয়া, আব্দুল হামিদের ছেলে ফিরুজ মিয়া, কাছম আলীর ছেলে সেলিম মিয়া, আশ্রব আলীর ছেলে মান্নান মিয়া।
তারা গত বছরের ২০ মার্চ দালালের খপ্পরে পড়ে পাড়ি জমায় লিবিয়ায়। বিদেশ যাওয়ার সময় প্রত্যেকের খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ করে টাকা। জমি বাড়ি বিক্রি করে দালালের টাকা পরিশোধ করলেও ১ বছর তিন মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন ওই ১৩ যুবক।
নিখোঁজ হওয়া যুবক মো. আলমগীরের মা রহিমা, সালমান মিয়ার বাবা হাসিম মিয়াসহ কয়েকজন বলেন, একই এলাকার পাঁচকাটা গ্রামের আদম ব্যবসায়ী ও লিবিয়া প্রবাসী ইব্রাহিম হোসেন ও স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী জামাল মিয়ার মাধ্যমে লিবিয়া নেওয়ার জন্য ৭ লাখ ৩৫ হাজার করে টাকা দেন। পরে আবার সেখান থেকে ইতালি পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে আবারো টাকা আদায় করে ভুক্তভোগীর পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে। কেউ কেউ টাকা না দেওয়ায় ওই যুবকদের হাত-পা বেঁধে মারধরের ভিডিও পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। এরপর গত বছরের ২১ এপ্রিল ঈদুল ফিতরের দিন থেকে তাদের আর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আমাদের সন্তানদের ফিরে চাই, দালালদের বিচার চাই।
জানতে চাইলে আদম ব্যবসায়ী ও লিবিয়া প্রবাসী ইব্রাহিম হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে, তার বাড়িতে গেলে তার স্বজনরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না।
তবে স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী অভিযুক্ত জামাল মিয়া টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে যুগান্তরকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, লিবিয়া প্রবাসী ইব্রাহিম হোসেন আমার বন্ধু। তিনি লিবিয়া থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কয়েকজনের টাকা পাঠাতে বললে আমি তাদের টাকা পাঠিয়েছি। এর বেশি আমি কিছুই জানি না। তবে ওই গ্রামের যুবকরা বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছে জেনে খুব খারাপ লাগছে।
মামলাটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ ওয়াদুদ মিয়া বলেন, গত মঙ্গলবার মামলাটি আদালতে দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি আদালত আমলে নিয়েছেন।
জেলার কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি। এ ঘটনার বিষয়ে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, আমি আজকেই যোগদান করেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব।