রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা সাধারণত আগস্ট মাসকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির মাস হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এবার জুন-জুলাই মাস থেকেই ডেঙ্গুরোগে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ডেঙ্গুজ্বরের মূল উৎস এডিস মশা দমনের মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বর নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পন্থা থাকলেও এ বিষয়ে গণমাধ্যমে যথেষ্ট লেখালেখি হলেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ সারাদেশে স্থানীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে না পারার কারণেই ডেঙ্গু এখন মহামারী রূপ নিতে শুরু করেছে। শুধুমাত্র সরকারি বা স্থানীয় প্রশাসনের সীমিত উদ্যোগে সারাদেশে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ সম্ভব নয়। সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের দায় ও ব্যর্থতা অবশ্যই আছে। তাদের উপর দায় চাপিয়ে বসে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। এডিস মশার লার্ভা উৎপাদনকারী পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতা দূর করার ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা এবং সামাজিক-পারিবারিক উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতিপূর্বে আর কখনো ডেঙ্গু এমনভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। সেইসাথে এবার ডেঙ্গুর ধরনও অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে জানাচ্ছেন ডাক্তার ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সংক্রমণে সর্বোচ্চ রেকর্ড এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও সরকারি হিসেবে সে বছর ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত বছর ৬২ হাজার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩৮২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা যায়। চলতি বছর আগস্ট মাস শুরুর আগেই ইতোমধ্যে সরকারি হিসেবে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অবস্থা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিতে চলেছে।
ডেঙ্গুজ্বরের কারণ ও উৎস সবারই জানা। সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন বছরে শত শত কোটি টাকা খরচ করে থাকে। এ খরচের কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নেই বললেই চলে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শুধুমাত্র সরকার বা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে প্রতিটি ঘরের কোণে বা বাড়ির বাইরে জমে থাকা পানিতে কিংবা ড্রেনে এডিস মশার লার্ভা দমন কিংবা ঘরে ঘরে মশারি টানিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এটি নিজেদেরই করতে হবে। তবে উন্মুক্ত নর্দমা, জলাধার, পরিত্যক্ত স্থানের পরিচ্ছন্নতা ও স্যুয়ারেজ সিস্টেমকে সচল রাখার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের। এখন আমরা এক জরুরি পরিস্থিতির সম্মুখীন। এখন হাসপাতালে ক্রমবর্ধন ডেঙ্গু রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। কোনো কোনো পরিবারে দু’তিনজন সদস্য ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থায় হাসপাতালে যাচ্ছে। জ্বরের শুরুতেই যে কোনো স্থানে ডেঙ্গু ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দরিদ্র-স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে কিংবা স্বল্প খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আগস্ট মাসে ডেঙ্গু মহামারি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেই লক্ষ্যে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রশাসনের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা মসজিদ-মন্দিরসহ সব সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে হবে। ডেঙ্গু ও এডিস মশা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করতে মসজিদের ইমামরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে ডেঙ্গু মহামারী মোকাবেলা করার কোনো বিকল্প নেই।