জনকল্যাণমূলক একটি সিদ্ধান্ত থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে সরে আসায় পর্যবেক্ষকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, যতদিন যাবে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবেশ দূষণকে আরও মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। সড়ক দুর্ঘটনার বেশিরভাগই এসব ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের কারণে হয়ে থাকে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত মে মাসে ৭৪ হাজার বাস, ট্রাক এবং অন্যান্য যানবাহন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের অবাধে চলতে আর কোনো বাধা নেই। এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু নয়। মানুষের জীবনকে জেনেশুনে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার শামিল। সড়কে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন চলা নতুন কিছু নয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও তা নির্বিঘেœ চলছে। সাধারণত একটি নতুন গাড়ির মেয়াদ গড়ে ২০ বছর ধরা হয়। তারপর এর চলাচলের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকে। উন্নত বিশ্বে মেয়াদপূর্তির আগেই গাড়ি জব্ধ করে স্ক্র্যাপ বা গুড়িয়ে দেয়া হয়। আমাদের দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি জব্দ করে স্ক্র্যাপ করার নজির নেই। এ ধরনের যানবাহন নিষিদ্ধ করার কথা বারবার বলা হলেও স্ক্র্যাপ করার কথা বলা হয়নি। প্রথমবারের মতো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এতে পরিবহন খাতে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরে আসার আশা জাগলেও তা এখন হারিয়ে গেছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পরিবহন মালিক সমিতির চাপে এবং রাজনৈতিক কারণে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে এসেছে। বলা হয়ে থাকে, পরিবহন খাতের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী এমপি ও নেতারা জড়িত। তাদের উপেক্ষা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। সরকারের এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পেছনে রাজনৈতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। সামনে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এমনটি করা হয়েছে। সরকার চাচ্ছে না, এ সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবহন খাতের সমর্থন হারাক। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত যানবাহনের কারণে যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে, অসংখ্য আহত হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে, সেখানে তা উপেক্ষা করা হয়েছে। দিন দিন সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে চলেছে। যাত্রীকল্যাণ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে সারাদেশে ৫০৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৭৬ জন নিহত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার কারণে তাদের পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়েছে। এত বড় ক্ষতি উপেক্ষা করে শুধু পরিবহন মালিকদের দাবীর মুখে একটি কল্যাণকর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা অত্যন্ত দুঃখজনক।
সড়ক-মহাসড়কে অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে যেন কেউ নেই। পুরো পরিবহন খাতে চলছে যথেচ্চার। এ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আর কোথাও আছে কিনা, আমাদের জানা নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বহু পদক্ষেপের কথা শোনা যায়। এ খাতের সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিলেও তা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিআরটিএ আমলে নিচ্ছে না। এর কারণ যে রাজনৈতিক, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতিগুলোর কাছে সবাই যেন আত্মসমর্পণ করে আছে। ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হলেও তাতে যেন তাদের কিছু যায় আসে না। এর দায়ও কাউকে নিতে দেখা যায় না। নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায় না। শুধুমাত্র সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শৈথিল্যের কারণে সড়কে বেঘোরে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে শুধু রাজনৈতিক কারণে একটি ভাল সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করা হলে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কারণে যত দুর্ঘটনা ঘটবে এবং মানুষ আহত-নিহত হবে, তার দায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।