ঠিক আগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ২০১৮ সালেও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। তবে এতটা গুমোটভাব ছিল না। সেই সময় ঢাকার পুঁজিবাজারে এই আগস্টে প্রতিদিন গড় টাকায় লেনদেন ছিল প্রায় ৫৮১ কোটি টাকার। আর স্টক প্রতিদিন হাতবদল হতো বা বেচাকেনা হতো গড়ে ১৭ কোটি ৬০ লাখ। ২০২১ সালের এই আগস্টে প্রতিদিন স্টক টার্নওভার ছিল ১০১ কোটির বেশি। এমনকি চলতি মাসের শুরুতেই বাজারমূলধনের আকার ছিল সাত লাখ ৮১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এক সময় তারা আমাদের বললেন বাজারে খেলোয়াড়দেরও প্রয়োজন আছে। তারা না হলে বাজার উঠবে না। খেলোয়ারদেরও একটা ভূমিকা আছে। ফলে দেখা যায় ৮০ টাকার শেয়ার হাজার টাকায় উঠে এলো। একসময় দেখা গেল এই এক হাজার টাকার শেয়ার নেমে ২৪০ টাকায় চলে এলো। তখন তারা ফ্লোর প্রাইজের চিন্তার বাস্তবায়ন করল। বলল, এটা বাজারের রক্ষাকারী। এইটা দিয়েছে তারা বিনিয়োগকারী বা বাজারকে বাঁচানোর জন্য নয়, ওদেরকে বাঁচাতে করেছে। তাদের সিদ্ধান্তগুলোই বাজারকে ক্ষতি করছে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো ওটাকে মেরে আবার ফ্লোর প্রাইজে নিয়ে আসে। এভাবেই বাজার চলছে।
তারা বলেন, এবার অনেকেই জাকাত দিতে পারেনি। কারণ শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি জাকাত দেবেন কোথা থেকে। আজ ১৪ মাস ধরে একই দরে শেয়ার বসে আছে ঝিম ধরে। হিসাবও তো ঠিক নাই। আজ থেকে চৌদ্দ মাস আগে লেনদেন হয়েছে ১১শ’ কোটি টাকা। আজ সেটা নেমে এসেছে ৩শ’ কোটি টাকায়। ১৩-১৪শ’ কোটি টাকার লেনদেন যখন হয়েছে, তখনকার ইনডেক্স আর এখনকার ইনডেক্সের অনেক তফাৎ। তখনকার লেনদেন উচ্চ হার ছিল। যারা মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে তাদের তো গত ১৪ মাসে সুদ হয়েছে। এই শেয়ারের কেনার মূল্য এখন আরো বেড়েছে। কিন্তু বাজার তো তলানিতে। তলানি ঠেকাতে এখন ফ্লোর প্রাইজ দিয়ে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। এখন যারা মার্চেন্ট ব্যাংকে নিজের টাকা ঢুকাইছে তারা কিছুই পাবে না।
তাদের বিশ্লেষণ, যে আইন দিয়ে রাখছে, কিন্তু কি হচ্ছে তার কোনো খবর নাই। ওনারা চার্জ কাটে, সুদ কাটে, যত রকমের খরচ সবই তারা গ্রাহক থেকে কেটে রাখে। গ্রাহক তো কিছুই ওই আইনের আওতায় পাচ্ছে না। লভ্যাংশ ও বোনাস তাদের হিসাবে যাবে, গ্রাহকের হিসাবে না। এভাবে তো বাজার চলে না।
এ দিকে স্টেকহোল্ডাদের সাথে সম্প্রতি এক বৈঠকে বিএসইসির কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ বলছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় দেশের প্রাইভেট সেক্টর হতে প্রতি বছর ২৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দরকার।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছুটা শঙ্কা তো বিনিয়োগকারীদের মনে আছেই। কারণ রাজনৈতিক একটা সঙ্কট ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনের আর চার মাস বাকি। এই সময়ে সবার ভেতরে একটা শঙ্কা কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইজ, সুদ হার সব কিছু মিলেই একটা চাপের মধ্যে আছে। তবে যদি সে রকম কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা না হয়, সুস্থ থাকে, তাহলে তেমন শঙ্কা নাই। বিনিয়োগকারীদের আগমনও কমেছে।
ফ্লোর প্রাইজের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভালো ভালো কোম্পানির শেয়ার ফ্লোর প্রাইজে থাকায় স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে। এটা বাজারের জন্য খুব বেশি ভালো খবর না। দেশ ও অর্থনীতির বর্তমান যে পরিস্থিতি এখনই বাজার খুব ভালো হওয়ার লক্ষণ দেখছি না। তিনি বলেন, বিএসইসি এত পদক্ষেপ নেয়ার পরও কেন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহুবিধ কারণ আছে এর পেছনে। ডলারের বিনিময় হার বেশি। টাকার অবমূল্যায়ন, বিদেশী বিনিয়োগ তেমন নাই এবং ব্যাংক সুদ হার বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বাজারের লেনদেন খুব বেশি কমে যায় তাহলে নিকট ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়াবে।