একটি একতরফা বা প্রতিদ্বন্দিতাহীন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে বাংলাদেশের বিগত প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ঐতিহ্য রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতা এবং বিরোধীদলের ভোট বর্জনের এক ভিন্নতর প্রেক্ষাপটে এবার দ্বাদশ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী দায়িত্ব পালন করতে চলেছে। দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশার বাস্তবতায় এটি একটি অতি স্পর্শকাতর সময়। পুলিশ, বিজিবি, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসনসহ দেশের সব সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন সরকারী দলের তল্পিবাহক হয়ে পড়েছে, তখন সশস্ত্র বাহিনীই একমাত্র ব্যতিক্রম। দেশের সাধারণ মানুষ সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেম, নিরপেক্ষতা ও পেশাদার ভূমিকার উপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র বাহিনী তার ভিত্তি লাভ করেছিল, সে বাহিনী নিঃসন্দেহে কোনো দলীয় সরকারের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার দ্বারা প্রভাবিত হবে না, জনগন এমনটাই বিশ্বাস করে। বিগত দু’টি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীকে অনেকটাই নিস্ক্রিয় দেখা গেছে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা, শান্তি প্রতিষ্ঠা, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ও জনকল্যাণে প্রসংশনীয় ভূমিকা পালনের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে। নিজ দেশে সশস্ত্র বাহিনীর অনুরূপ ভূমিকাই প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ। নির্বাচনে জাতীয় সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা ও দলমত নির্বিশেষে ঐক্য ও আস্থার প্রতীক। এ ক্ষেত্রে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হলে সেটা সমস্ত বাহিনীর মর্যাদা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বরখেলাফ হবে। দেশে দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকার কারণে নতুন প্রজন্মের মার্কিন তরুনরা এখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে বলে জানা যায়। যে কোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এটি অনেক বড় ক্ষতি।
দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এসব নির্বাচন সুষ্ঠু কিংবা অংশগ্রহণমূলক হয়নি। দিনের ভোট রাতে হয়েছে, ভোটাররা প্রতারিত হয়েছে। অথচ এসব নির্বাচনেও বেশ কয়েকদিন ধরে সেনাবাহিনী মাঠে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে যেভাবে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া হয়েছে, তাতে সীমার বাইরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করা সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা উচিতও নয়। এবারের নির্বাচন একতরফা হলেও সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে তার আলামত দেখা গেছে। নির্বাচনের আগে-পরে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমর্যাদা বলতে যা বুঝায়, সেটা অক্ষুণœ রাখতে হবে। আমরা আশা করব, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও অবহিত রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনী জাতির আস্থা ও গর্বের প্রতিক। এ বাহিনীর যে কোনো অমর্যাদা ও অনভিপ্রেত ভূমিকা দেশের মানুষকে ব্যথিত ও আশাহত করে।