দুর্বল ব্যাংক সবল ব্যাংকের সাথে একীভূত হবে
ব্যাংক সংস্কারের ঘোষণা দেয়ার আগেই ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন (পিসিএ) ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে একটি সার্কুলার দেয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সঙ্কট কাটিয়ে সক্ষম করার জন্য ওই ফ্রেমওয়ার্ক করা হয়। তাতে বলা হয়, যারা দুর্বলতা কাটাতে পারবে না তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলারে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ থেকে পিসিএ ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, মার্জ করা হবে ২০২৫ সালের মার্চের পরে, তার আগে নয়। তার আগে কোনো দুর্বল ব্যাংক সবল হয়ে গেলে তারা আর মার্জিংয়ের নীতিতে পড়বে না। এই সময়ে সবল হতে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নীতি সহায়তা দেবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খুব দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত করার নীতি আরো স্পষ্ট করবে। যারা দুর্বল তাদের পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেস করা হবে।’
‘কাজটি অনেক চ্যালেঞ্জিং’
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘যদি সবল ব্যাংকের সাথে দুর্বল ব্যাংক মার্জ করতে হয় তাহলে দ্রুতই দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে হবে। নতুন যে পরিচালনা পর্ষদকে দায়িত্ব দেয়া হবে তাদের কাজ হবে ব্যাংকের দায় দেনা হিসাব এবং ব্যাংক দুর্বল হওয়ার জন্য কারা দায়ী তা চিহ্নিত করা। এরপর কাজ হলো সবল ব্যাংকের সাথে সমঝোতা করা। কারণ সবল ব্যাংককে বললেই তো সে দুর্বল ব্যাংককে নেবে না। একটি দুর্বল ব্যাংককে মার্জ করার জন্য সরকার কত টাকা দেবে তা নির্ধারণ করা। এই সময়ে ব্যাংকের লোন দেয়াসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্রাহকরা কোনো ক্ষতির মুখে পড়বেন কিনা তা নির্ভর করবে সরকারের বেলআউট পলিসির ওপর। সরকার যদি শতভাগ গ্যাপ পূরণ করে দেয় তাহলে গ্রাহকদের ক্ষতি হবে না। আর কিছু লোক তো চাকরি হারাবেনই। কারণ দু’টি ব্যাংক এক হলে, এক ব্যাংকের তো একই এলাকায় দু’টি শাখা থাকবে না। এখন তো দু’টি ব্যাংকেরই শাখা আছে। তবে তিন বছর পর্যন্ত ছাঁটাই করা হবে না বলা হচ্ছে।’
তার কথায়, ‘মার্জিং ভালো উদ্যোগ। এটা করতে পারলে অনেক ভালো হবে। কিন্তু এর জন্য সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। শুরুতেই তো তিন বছর সময় নেয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখা যাক।’
‘মার্জ হলে কিছু লোক চাকরি হারাবেন’
যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো: নুরুল আমিন বলেন, ‘মার্জিং একটা ভালো উদ্যোগ। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সফল। কিন্তু এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি কী হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।’
তবে তিনি মনে করেন, ‘বাস্তবায়ন পর্যায়ে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন মার্জ করার জন্য সবল ও দুর্বলকে রাজি করানো, কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি থাকবে কিনা, রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হবে কিনা ইত্যাদি। একটি ব্যাংকের সাথে আরেকটি ব্যাংককে মার্জ করতে বললেই তো হবে না। এটা সমঝোতার মাধ্যমে হতে হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে নীতিমালা স্পষ্ট করতে হবে। ডায়ালগ করতে হবে।’
যমুনা ব্যাংকের সাবেক এই এমডি বলেন, ‘মার্জ হলে কিছু লোক চাকরি হারাবেন। তবে তিন বছরে তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে না। পলিসি স্পষ্ট হতে হবে। যাদের বিদায় করা হবে তাদের কী উপায়ে বিদায় দেয়া হবে তা আলোচনা করে ঠিক করতে হবে।’
আর গ্রাহকদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। কারণ প্রথমত বাংলাদেশে কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না। নজির নেই। আর গ্রাহকদের ব্যাপারটাও মার্জিং পলিসিতে থাকে।’
গ্রাহকেরা কী বলছেন?
একটি ব্যাংকের গ্রাহক আতিকুর রহমান আকাশ বলেন, ‘সঠিক নীতিমালার ভিত্তিতে করলে আমার মনে হয় ভালোই হবে। তবে আমার আশঙ্কা, দুর্বল ব্যাংককে কাঁধে নিতে যেয়ে সবল ব্যাংকটি আবার দুর্বল হয়ে না যায়।’
আরেক গ্রাহক শেখ আব্দুস সাত্তার লিমন বলেন, ‘মূল কথা হলো এটা কতটা স্বচ্ছতার সাথে করা হবে। দেখা যাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় সবল ব্যাংককে দুর্বলের তালিকায় ফেলা হবে। আবার দুর্বল ব্যাংককে সবলের তালিকায় রাখা হবে। তাহলে তো গ্রাহকরা লাভবান হবে না, তারা ভুল তথ্য পাবে। তবে দুর্বল ব্যাংক এখন গ্রাহকরা চেনে। সেখানে এমনিতেই তারা টাকা রাখা কমিয়ে দিয়েছে।’
বাংলাদেশে এখন মোট বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। মোট খেলাপি ঋণের ৬৩ শতাংশই আছে ১০টি ব্যাংকে। আর মূলধন ঘাটতিতে আছে ১৪টি ব্যাংক। তাদের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এর বাইরে পাঁচটি ইসলামি ধরার ব্যাংককে মূলধন ঘাটতি কাটাতে নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৪০টি ব্যাংক মোটামুটিভাবে ভালো করছে। বাকিগুলোর অবস্থা খারাপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ ছিল এক লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯.৯৩ শতাংশ। তবে দুর্দশাগ্রস্ত ও পুনঃতফসিল কিংবা অবলোপনের পরও আদায় না হওয়া ঋণের পরিমাণ চার লাখ কোটি টাকার বেশি, মোট ঋণের যা ২৬ শতাংশ।
সূত্র : ডয়চে ভেলে