বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের অতীতের দুর্ঘটনার খবরের কিয়দংশ প্রকাশিত হয়েছে, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এক খবরে বলা হয়েছে, গত ৯ বছরে (২০১৫-২০২৩ সাল পর্যন্ত) এক লাখ ৯০ হাজার ১৬৭টি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে এক হাজার ৫১ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে তিন হাজার ৬০৬ জন।বিআরটিএ বলেছে, গত বছরে সড়কে ঝরেছে ৫০২৪ প্রাণ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে ২৪ হাজার ৯৫৪ জন। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত জিডিপির ক্ষতি হচ্ছে ৫.৩%।বড় অগ্নিকাণ্ডের সব মামলা হিমঘরে। সম্প্রতি প্রকাশিত দুর্ঘটনার উৎসের খবর হচ্ছে, জরাজীর্ণ সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার চলছে। নামীদামী রেস্টুরেন্টে ফায়ার সেফটির বালাই নেই। দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ঢাকা। চট্টগ্রামে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার তোয়াক্কা করে না ভবন মালিকরা। ঢাকার বহুতল বাণিজ্যিক ভবনগুলো অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে দুইজনের মৃত্যু। দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশায় ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ২। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ জরিপ রিপোর্ট মতে, ঢাকার ৯৬% বিপণীকেন্দ্র, ৯৮% শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৯৮% হাসপাতাল-ক্লিনিক অগ্নি ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া, চট্টগ্রামে আগুনের ঝুঁকিতে রয়েছে ৫৪.২৯% ভবন। অগ্নিঝুঁকিতে রাজশাহীর পাঁচ মার্কেট। দেশের অন্য শহরের অবস্থা কম-বেশি একই! তাই সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা জিএম কাদের, এমপি বলেছেন, পুরো দেশটাই যেন অগ্নিঝুঁকিতে। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ডয়চে ভেলের টকশো-তে গ্লোবাল টেলিভিশনের প্রধান স¤পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, বাংলাদেশের একটা প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে না, সবগুলো ভেঙ্গে পড়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সাবেক পরিচালক, একেএম শাকিল নেওয়াজ এক নিবন্ধে বলেন, আমরা কেউ নিরাপদ নই, হাসপাতাল শপিং মল, রেস্টুরেন্ট- কোথাও না। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান বলেন, আইন লঙ্ঘন করে ভবন মালিকেরা বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাবে এবং মানুষকে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে, এটা চলতে পারে না। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। অন্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী শুধু অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করলে সব অনিয়ম রাতারাতি ঠিক হতে বাধ্য।কারণ, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট হলো ভবন ব্যবহার করার অনুমতিপত্র। রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিন যাচাই করার পর এ সনদ দিবে। এই সনদ ছাড়া কোনো সেবা সংস্থার ইউটিলিটি সেবা তথা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিতে পারবে না। গত ৫ মার্চ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সমন্বয় করে রাজধানীর অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, তারানা হালিম,এমপি বলেন, ঝুঁকি এড়াতে পুরানো ঢাকার কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিগুলো সরিয়ে নিতে হবে।একই দিনে বাপা, বিআইপি ও বেলা আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলেন,ভবনে অগ্নিকাণ্ড ও এসব ঘটনায় হতাহতের জন্য অনুমোদন প্রদানকারী সাতটি সংস্থার(উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, ওয়াসা, তিতাস, ডিপিডিসি/ডেসা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ভবন মালিককে অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের আসামি করে আইনের আওতায় আনতে হবে। গত ৫ মার্চ রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে রাজধানীর অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হবে।
নানা ধরণের ব্যাপক দুর্ঘটনার কারণে দেশ এখন মৃত্যুকুপে পরিণত হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ ও সংশ্লিষ্টরা চিহ্নিত হয়েছে অনেক দিন আগে। কিন্তু তার প্রতিকারের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। যেমন:২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরাণ ঢাকার চানখারপুলের নিমতলীতে ক্যামিকেলের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন নিহত হয়। আহত হয় অর্ধশত এবং কারখানা ও বাড়ি পোড়ে ২৩টি। তারপর পুরাণ ঢাকার সব কেমিক্যাল গুদাম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অভিযানও চালোন হয়। উপরন্তু ঢাকার বাইরে কেমিক্যাল গুদাম এলাকাও তৈরি করা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেখানে যাচ্ছে না। তারা এখনো পুরাণ ঢাকার বেশিরভাগ বাসার নিচে কেমিক্যাল গুদাম রেখে কারবার করছে। দেশের সড়কে বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক দুর্ঘটনা ঘটার প্রধান কারণ বেশিরভাগ চালক অদক্ষ। এছাড়া, টিআইবি বলেছে,দেশে চলাচলকারী বাসের নিবন্ধন নেই ১৮.৯%, ফিটনেস নেই ২৪%, ট্যাক্স টোকেন নেই ১৮.৫% ও রুট পারমিট নেই ২২%। তবুও বন্ধ করার উদ্যোগ নেই। এসব অবস্থা দুর্ঘটনার উৎসের প্রতিটি ক্ষেত্রেই। জবাবদিহিতা না থাকায় এ অবস্থা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, সার্বক্ষণিক উন্নতির ডঙ্কা বাজানো হচ্ছে। কিন্তু জীবনের মূল্যের চেয়ে উন্নতির মূল্য কি বেশি? মোটেও না। নিরাপত্তাহীন ও পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্নতি মূল্যহীন। যাহোক, দুর্ঘটনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে।এ থেকে পরিত্রাণ দরকার। নতুবা জানমাল রক্ষা হবে না, কাক্সিক্ষত উন্নতিও হবে না। তাই দুর্ঘটনা রোধ করা অপরিহার্য। সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে অত্যন্ত দৃঢ়তা, সততা ও নিরপেক্ষভাবে। দুর্ঘটনার উৎস বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিলেই সফলতা নিশ্চিত। কারণ, কোন শক্তিই রাষ্ট্রীয় শক্তির চেয়ে অধিক শক্তিশালী নয়। এর জ্বলন্ত প্রমাণ ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ বছিলা খালের উপর নবনির্মিত ১০তলা বিল্ডিং গুড়িয়ে দেওয়া। সম্প্রতি উক্ত বিল্ডিং অভিযান কালে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে খালের অংশ দখল করার কারণে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনও অবৈধ হাসপাতাল,ক্লিনিং,ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। সে মতে ইতোমধ্যেই অনেক অবৈধ হাসপাতাল,ক্লিনিং,ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় অবৈধ হোটেল- রেস্তোঁরার বিরুদ্ধেও অভিযান শুরু করেছে সরকারী বিভিন্ন সংস্থা পৃথক পৃথকভাবে। কিন্তু কোথাও বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। বরং তালা লাগিয়ে পালিয়েছে মালিকরা। শুধু হোটেল মালিক সমিতি বলেছে,বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তবুও অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে টাক্সফোর্স গঠন করে অভিযান শুরু করতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং, মার্কেট, স্থাপনা, যানবাহন ইত্যাদির বিরুদ্ধে এবং তা সারা দেশে একযোগে। মাননীয় হাইকোর্ট গত ৪ মার্চ পৃথক ২টি রায়ে রাজধানীর ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণে কি ব্যবস্থা রয়েছে, তা দেখতে কমিটি গঠন ও চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দৃশ্যমান স্থানে নোটিশ টানানোর নির্দেশ এবং বহুতলবিশিষ্ট ভবন, কারখানা ও স্থাপনায় গত বছর ও চলতি বছর সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কতজন নিহত হয়েছেন, জীবন-স¤পত্তির কেমন ক্ষয়ক্ষতি ও কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব তথ্য জানিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। স্মরণীয় যে, বিদেশী গার্মেন্ট ক্রেতা সংগঠনগুলোর প্রবল দাবির প্রেক্ষিতে বেশিরভাগ গার্মেন্ট কারখানাকে পরিবেশ বান্ধব করা হয়েছে। ফলে সেখানে দুর্ঘটনা অনেক কমে গেছে। তাই দেশব্যাপী সব ধরণের দুর্ঘটনার উৎস বন্ধ করতে পারলে দুর্ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।জানমাল রক্ষা পাবে।উন্নতি ত্বরান্বিত ও টেকসই হবে।