আতঙ্ক কাটলেও জনমনে শঙ্কা
ডাকাতদের তৎপরতা কমলেও বাড়ছে চোরাগোপ্তা খুন-জখম
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৪, ১:০৩ এএম (ভিজিট : ২৬৪)

কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার তোপের মুখে পড়ে গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সংঘাত-সহিংসতা, থানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে রাজধানীসহ সারা দেশ।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্বৃত্তরা বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে বাড়িতে বাড়িতে ডাকাতি শুরু করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একপর্যায়ে আতঙ্ক শুরু হয়। উপায় না পেয়ে মানুষ রাস্তায় লাঠি-বাঁশি নিয়ে পাহারা বসিয়ে নির্ঘুম রাত কাটায়। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মসজিদের মাইকে সতর্ক করা হয়। কড়া পাহারায় একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন ডাকাত সদস্যকে আটকের পর সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এলাকাভিত্তিক কড়া পাহারার পর ডাকাতদের তৎপরতা কমলেও বেড়েছে চোরাগোপ্তা খুন-জখমের ঘটনা। ডাকাত আতঙ্ক কাটলেও চোরাগোপ্তা খুন-জখম বাড়ায় জনমনে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়া স্বেচ্ছায় ট্রাফিকের কাজ করা দুই ছাত্র ও হোটেলের এক ম্যানেজারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
প্রাথকিমভাবে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ জনপদ মোড়ে রোজভিউ আবাসিক হোটেলের ভেতর নারীঘটিত বিষয় নিয়ে ওই তিনজনকে বেদম পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন রাজধানীর ওয়ারীতে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুই ভাইকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু জখমের ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে।
উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা শান্তা আকন্দ সময়ের আলোকে বলেন, গত ৫ আগস্টের পর প্রায়ই ডাকাত পড়ত। এলাকার মসজিদগুলোতে মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। রাস্তায় মানুষের ডাকাত-ডাকাত শব্দে ঘুম ভাঙে। স্বামী-সন্তান নিয়ে ওই সময়টা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম।
শান্তা বলেন, ডাকাতের উৎপাত কমলেও শঙ্কা কমেনি এখনও। প্রায় প্রতিদিনই মধ্যরাতে আমার মেয়েটার ঘুম ভেঙে যায়। আগে এই সমস্যা ছিল না। আমারও আতঙ্কে ঘুম আসে না রাতে।
তিনি বলেন, পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর টহলে উপস্থিতি কম থাকায় ডাকাতরা সুযোগটা নিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিদ্রুত থানা-পুলিশকে সচল করতে হবে। তা না হলে ডাকাতরা এই সুযোগটা নেবে।
উত্তরা ১৪ নম্বরের বাসিন্দা তুষার আহমেদ সময়ের আলোকে জানান, মাঝে কয়েক দিন ডাকাত আতঙ্কে তিনি নিজেই পাহারায় ছিলেন। বাসাবাড়িতে ছোট ছোট তিন সন্তান ও স্ত্রী সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাতেন। এরপর এলাকাবাসীর সঙ্গে তিনি নিজেও সার্বিক নিরাপত্তায় লাঠি-বাঁশি নিয়ে রাত কাটিয়েছেন। থানাগুলোতে যেহেতু পুলিশ সংকট তাই আতঙ্কটাও বেশি। শিগগিরই পুলিশকে আগের মতো ডিউটিতে ফেরাতে হবে। তা না হলে এই স্বাভাবিক পরিস্থিতি ঠেকানো চ্যালেঞ্জিং হবে।
খিলগাঁওয়ের গোড়ানের বাসিন্দা মানিক মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, পরিবার নিয়ে কয়েক দিন ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। এখন ডাকাতদের উৎপাত কমেছে। তবে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে এলাকার আধিপত্য। দখলবাজি-চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রায় মারামারির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় অনেকে জখম হয়েছে।
ওয়ারির একেএম সাহা রোডের বাসিন্দা আসলাম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে ডাকাতের উৎপাত কমেছে। পুলিশ না থাকায় সেনাবাহিনী মাঝেমধ্যে টহল দিচ্ছে। যার কারণে অনেকটা ডাকাতমুক্ত। কিন্তু গত মঙ্গলবার পূর্বশত্রুতার জেরে আল আমিন ভূইয়া (৪২) ও নুরুল আমিন ভূইয়াকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার কোনো মানে হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে না থাকার কারণে এমন আরও অনেক ঘটনার জন্ম নেবে। তাই দ্রুত পুলিশকে মাঠে নামিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে বেড়ানোয় আরেকটি গ্রুপ এসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে গত বৃহস্পতিবার গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীতে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে গার্মেন্ট কারখানা দখল ও একজন নারী উদ্যোক্তার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত টঙ্গী পূর্ব থানার আরিচপুর গার্লস স্কুলসংলগ্ন ব্যবসায়ী রাশেদা ফারুকের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমেই বাড়ির সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে এবং বাড়ির গ্যারেজে থাকা একটি প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-ঘ-২১-৮০৫২) ভাঙচুর করে। পরে হামলাকারীরা বাড়ির কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। এ সময় বাড়ির সদস্যদের চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত চলে যায়।
টঙ্গী বাজারের ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম সময়ের আলোকে জানান, গত ৫ আগস্টের পর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গী বাজারস্থ সেনাভান মার্কেটের মরগি বাজার দখল নিতে দফায় দফায় লোকজন আসা যাওয়া করছে। এমনকি সমিতির অফিস কক্ষের তালা ভেঙে নতুন তালা লাগিয়ে দিয়ে হুমকি দিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর সময়ের আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে সহিংসতা হয়েছে তাতে থানা ও পুলিশের সদস্যরা আক্রান্ত হয়ে অনেকে নিহত হয়েছেন। ওই পরিস্থিতে থানাগুলোতে পুলিশ না থাকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশ এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় থানাগুলো সচল করা হয়েছে। যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল করে পুলিশের সহায়তা নিতে পারবে যে কেউ। সহিংসতার পর থানাগুলোতে থাকা গাড়িগুলো পুড়ে যাওয়ায় পুলিশের টহল কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে এ সংকট দ্রুতই সমাধান হবে বলে তিনি জানান।


