অন্যদিকে রংপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অটোরিকশাচালক মানিক মিয়ার নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা, সংসদ সদস্যসহ ১১৯ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় আরও ১৩ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ ৩ হাজার ৩২৮ জনকে আসামি করা হয়।
আদালত প্রতিবেদক জানান, রাজধানীর মিরপুরে লিটন হাসান লালু ওরফে হাসানকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিহত লিটন হাসান লালুর ভাই মিলন বাদী হয়ে মামলা করেন। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে মিরপুর মডেল থানা পুলিশকে মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান (নিখিল), ইলিয়াস মোল্লা, কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার, ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য সচিব এসএম মান্নান (কচি)।
মামলায় অভিযোগ থেকে জানা যায়, দেশে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলাকালে লিটন হাসান লালু গত ৪ আগস্ট মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। দুপুর ২টার দিকে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আবদুল্লাহ আল-মামুন, হারুন-অর-রশীদ, আসাদুজ্জামান খান, বিপ্লব কুমার ও হাবিবুর রহমানের নির্দেশে অন্যান্য আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ৩০০ জন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি করে। অজ্ঞাত আসামির ছোড়া বুলেটে হাসান গুলিবিদ্ধ হন। পরে আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা মহানগর উত্তরের ১১নং ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ কবির খানকে হত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ৬৭ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মেহেদী হাসানের আদালতে এ মামলাটি করেন নিহতের স্ত্রী আফসানা ইসলাম। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে মিরপুর মডেল থানা পুলিশকে মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
মামলায় উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈনুল হোসেন খান নিখিল, সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী মো. কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ মান্নান কচি ও যুবলীগ নেতা মেসবাউল আলম সাচ্চু।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় আইডিয়াল স্কুলের সম্মুখে ছাত্র-জনতা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। এ সময় ভুক্তভোগী আবদুল্লাহ কবির খান আন্দোলনে আহত ছাত্রদের সহযোগিতা করে রিকশায় তুলে চিকিৎসার জন্য পাঠাচ্ছিলেন। সে সময় শেখ হাসিনার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালালে তিনি নিহত হন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় কাঠমিস্ত্রি তারিক হোসেনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারিকের মা মোসা. ফিদুশি খাতুন বাদী হয়ে মামলা করেন। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহা দিবা ছন্দা বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে শেরেবাংলা নগর থানার সামনে রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হন তারিক হোসেন। তাকে দ্রুত পাশর্^বর্তী শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ আগস্ট তিনি মারা যান।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলের ১০৮ নেতাকর্মীর নামে চট্টগ্রামে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের মা জোছনা বেগম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। গত রোববার রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় এই মামলা হয়। পাঁচলাইশ থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ১০৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত হিসাবে আরও দেড়শ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গত ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নগরীর মুরাদপুর-ষোলশহর এলাকায় ছাত্রলীগের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে ওয়াসিম আকরামসহ তিনজন নিহত হন। নিহত ওয়াসিম আকরাম (২২) চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র এবং কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তার বাড়ি কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা গ্রামে।
মামলায় অন্য আসামিদের মধ্যে আছেন দলের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। এই মামলায় অনেক চসিক কাউন্সিলরকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেনÑশৈবাল দাশ সুমন, আবদুস ছবুর লিটন, এসরারুল হক, মোবারক আলী, হারুন অর রশীদ, মোরশেদুল আলম, নুর মোস্তাফা টিনু, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, আশরাফুল আলম, গিয়াস উদ্দিন, জহরলাল হাজারী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, জিয়াউল হক সুমন, পুলক খাস্তগীর, নুরুল আলম মিয়া, মোহাম্মদ ওয়াসিম ও আবদুস সালাম মাসুম। এ ছাড়াও নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি, যুবলীগ নেতা মো. ফিরোজ, দেবাশীষ পাল দেবু, ছাত্রলীগ নেতা নুর নবী সাহেদসহ আরও অনেককে।
দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগর এলাকায় স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে দিনমজুর বাবু মিয়া গুলিবর্ষণে নিহতের ঘটনায় দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মোহাম্মদ আলী সুমন ও পৌর মেয়র নাইম ইউসুফ সেইনসহ ৪০০ জনের বিরুদ্ধে দাউদকান্দি মডেল থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় পৌরসভার মেয়রসহ আরও জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে। বেশিরভাগ আসামি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। সোমবার দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মো. মোজাম্মেল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশ জানায়, গত রোববার বিকালে মামলাটি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন শহীদনগরে নিহত দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত হোসেনের মামা আবদুর রাজ্জাক ফকির। মামলায় এজাহারভুক্ত ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। একই দিন অন্য মামলাটি করেন গত ৫ আগস্ট বিকালে গুলিবিদ্ধ নিহত দিনমজুর বাবুর প্রতিবেশী লিটন আহম্মেদ পাভেল বাদী হয়ে। মামলায় ৪৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে সদর থানায় মামলা করা হয়েছে। সোমবার সকালে জেলা বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক সাকিব আহমেদ বাপ্পি বাদী হয়ে সদর থানায় এ মামলা করেছেন। মামলায় ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নায়েব আলী জোয়ারদার, ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম অপু, সাবেক সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী, সদর পৌরসভার মেয়র কাইয়ূম শাহরিয়ার জাহেদী হিজল, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি জীবন কুমার বিশ^াস, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বিশ্বাস, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সজীব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আল-ইমরানসহ ৪৬৮ জনের নামে মামলা হয়েছে।
গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীরা বিএনপির জেলা কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনায় জেলা বিএনপির কার্যালয়ে থাকা আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। এতে দলীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়। ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি শাহিন উদ্দিন জানান, বিএনপির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৪৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা হয়েছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধর ও বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমানকে প্রধান করে ও ৫১ আওয়ামী লীগ নেতার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় বর্তমান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং পৌর মেয়রের নাম নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল রাতে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বিশ্বাস বাদী হয়ে কলাপাড়া থানায় এ মামলাটি করেন।
মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, গত বছরের ৩০ আগস্ট রাত ৮টার দিকে আসামিরা বিএনপি কার্যালয়ে প্রবেশ করে নেতাকর্মীদের মারধর, চেয়ার-টেবিল ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এ ছাড়া বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণ করে বিএনপি কার্যালয়ের টিভি ও সিলিং ফ্যান লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। কলাপাড়া থানার ওসি তদন্ত মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিজয় মিছিলে গুলিতে নিহত স্কুল শিক্ষার্থী মো. মারুফ মিয়াকে হত্যার অভিযোগে সাবেক কৃষিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো. আবদুর রাজ্জাক ও সাবেক বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর নামে হত্যা মামলা করা হয়েছে। রোববার রাতে মারুফের মা মোছা. মোর্শেদা বাদী হয়ে ৫৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা করেন। সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- টাঙ্গাইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির, টাঙ্গাইল-৪ আসনের সাবেক এমপি হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী, টাঙ্গাইল-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেন, টাঙ্গাইল-৭ আসনের সাবেক এমপি খান আহমেদ শুভ, টাঙ্গাইল-৮ আসনের সাবেক এমপি অনুপম শাহজাহান জয়, টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি, সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন ও সাইফুজ্জামান সোহেল, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক বদিউজ্জামান ফারুক, দফতর সম্পাদক মো. খোরশেদ আলম, উপ-দফতর সম্পাদক আনন্দ মোহন, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মামুনুর রশিদ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক হোসেন মানিক, সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন তোফা, শহর আওয়াম লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ রৌফ, সহ-সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বড় মনি, জেলা যুবলীগের সভাপতি মাসুদ পারভেজ, সাধারণ সম্পাদক আবু সাইম তালুকদার বিপ্লব, কাউন্সিলর তানভীর ফেরদৌস নোমান, কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আতিকুর রহমান মোরশেদ, কাউন্সিলর হাফিজুর রহমান স্বপন, কাউন্সিলর কামরুজ্জামান মামুন, কাউন্সিলর আমিনুর রহমান আমিন, কাউন্সিলর আবদুল্লাহ আল মামুন বাদশা, কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান প্রিন্স, ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ, শীর্ষ সন্ত্রাসী আতিকুর রহমান রনি (কোয়ার্টার রনি), ক্যাম্প সোহেল, ডন সোহেল।
টাঙ্গাইল সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন বলেন, নিহত স্কুল শিক্ষার্থীর মা মোছা. মোর্শেদা বাদী হয়ে ৫৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
কুমিল্লা সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মাসুম মিয়া (২০) নামে এক যুবককে খুনের ঘটনায় সদর আসনের সাবেক সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহার ও তার মেয়ে সিটি মেয়র তাহসীন বাহারসহ ৬২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় আরও অন্তত ৪শকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
রোববার রাতে নগরীর দিশাবন্দ এলাকার মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে আবদুল হান্নান বাদী হয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি মো. আলমগীর ভূঁইয়া।
গত ৪ আগস্ট কুমিল্লা নগরীর ২২ নং ওয়ার্ডের উত্তর রামপুরের শাহিন মিয়ার ছেলে মাসুম মিয়া কোটবাড়ী বিশ^রোডস্থ নন্দনপুরে শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে নিহত হন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয় কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন বাহারকে। দ্বিতীয় আসামি করা হয় তার মেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পলাতক মেয়র তাহসিন বাহার সূচনাকে। এ ছাড়া কুমিল্লা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুল, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী যুবলীগের আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিক উল্লাহ খোকন, কুমিল্লা সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আহম্মেদ নিয়াজ পাভেল, কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম রিন্টু, সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান পিয়াস, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হাবিবুর আল আমিন সাদীর নামও মামলায় রয়েছে।
পটিয়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে হামলার অভিযোগে চট্টগ্রামের পটিয়ায় সাবেক এমপি ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, সদ্য বিদায়ি উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল আলম দিদারসহ ৩০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সোমবার দুপুরে পটিয়া আল জামিয়া আল ইসলামিয়া মাদরাসার ছাত্র নুরুল হাসান বাদী হয়ে এই মামলা করেন। জানা গেছে, সারা দেশের ন্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পটিয়াতেও হয়। গণঅভ্যুত্থানের আগের দিন ৪ আগস্ট পটিয়া মাদরাসা থেকে এক হাজারের অধিক ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
পটিয়া থানার ওসি জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলি ও হামলার ঘটনায় ৭৯ জনের নামে একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। মামলায় ৯৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়। গত বুধবার শহরতলির বিরাসার গ্রামের মো. সোলেমান বাদী হয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফরহাদ রায়হান ভূঁইয়ার আদালতে এই মামলাটি করলে গত রোববার আদালত মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আহত সোলেমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। স্বৈরাচার ‘শেখ হাসিনা’ পতনের এক দফা দাবির আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ও কর্মসূচি অনুযায়ী বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গত ৪ আগস্ট বেলা ১১টা থেকে ১২টার দিকে শহরতলির বিরাসার এলাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে জড়ো হন। খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসীরা ককটেল, বোমা, পিস্তল ও দা নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলা করে।
সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এতে সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানকে প্রধান করে ৩২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার বিকালে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রশিদ। এর আগে রোববার রাতে নিহত শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেনের বাবা মো. আলমগীর বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট সকালে সাভারের আউকপাড়া এলাকার ভাড়া বাসা থেকে শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কিনতে সাভার বাসস্ট্যান্ডে যান। এ সময়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলিসহ হামলা চালায় মামলার আসামিরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন। পরে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিওতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গুলিতে মাছ ব্যবসায়ী মিলন নিহতের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত মিলন সিদ্ধিরগঞ্জ পুল এলাকায় মাছের ব্যবসা করতেন। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ঝাটরা গ্রামে।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক। রোববার রাতে নিহত মিলনের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন।
সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সিলেটে সাংবাদিক এটিএম তুরাব ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের নিহতের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলায় আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে। এর মধ্যে একটি মামলায় সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকেও আসামি করা হয়েছে। উভয় মামলায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ পুলিশ সদস্য, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতৃবৃন্দ এবং বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।
সোমবার বেলা ১১টায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নামোল্লেখসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। আদালত শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, পিআরও, সাবেক কাউন্সিলর ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের আসামি করা হয়েছে।
রংপুরে শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা
রংপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অটোরিকশাচালক মানিক মিয়ার নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা, সংসদ সদস্যসহ ১১৯ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করা হয়েছে।