এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে ব্র্যাক ব্যাংক চালু করে ইলেকট্রনিক লোন অ্যাপ্লিকেশন প্রপোজাল (eLAP) বা ই-ল্যাপ। লোন প্রক্রিয়াকে দ্রুত এবং অধিক কার্যকর করে তোলার একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এটি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দেশব্যাপী ৪৪৬টি এসএমই ইউনিট অফিসে এটি চালু করা হলে বাংলাদেশের এসএমই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায়।
এর ফলে, সত্যিকার অর্থেই ব্যাংকিং খাতে লোন ম্যানেজমেন্টে আমূল পরিবর্তন এসেছে।
ই-ল্যাপ চালু হওয়ার আগে ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া ছিল অনেকগুলো ধাপে বিভক্ত। ঋণ আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে ঋণ অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ম্যানুয়াল ডেটা এন্ট্রি ও ডকুমেন্ট হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজন হতো, যেটি ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং এখানে ভুল হওয়ার প্রবণতাও ছিল অনেক বেশি। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই ব্র্যাক ব্যাংক চালু করে ই-ল্যাপ। ভিফিন সল্যুশনস লিমিটেডের তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করা খুবই সহজ। লোকাল রেগুলেশন সম্পূর্ণরূপে মেনে চলার পাশাপাশি ই-ল্যাপ বিভিন্ন স্তরের প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যবহারকারীদের জন্য উপযোগী একটি প্ল্যাটফর্ম।
ই-ল্যাপের কারণে ব্র্যাক ব্যাংকের কার্যক্রমে গতি ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
লোন প্রসেসিং টাইম কমানোই ছিল মূল লক্ষ্য: ডকুমেন্ট হ্যান্ডলিং এবং বিভিন্ন স্তরের অনুমোদনের কারণে আগে এসএমই লোনের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে গড়ে ১৫ কর্মদিবসের প্রয়োজন হতো। তবে, ই-ল্যাপ চালু হওয়ার ফলে এই সময় কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দিনে। কারণ, এখন আগের চেয়ে দ্রুততর সময়ে যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
ডকুমেন্ট হ্যান্ডলিং আগের চেয়ে আরও সহজ হয়েছে। এখন লোন অ্যাপ্লিকেশন জমা দেওয়া যায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ফলে, শুধুমাত্র চূড়ান্ত ধাপে আবেদনকারীকে স্বাক্ষরের জন্য উপস্থিত হতে হয়। এটি কাগজপত্রের ঝামেলা কমিয়েছে এবং রিলেশনশিপ অফিসারদেরও বারবার ভিজিটের প্রয়োজন হয় না।
রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ই-ল্যাপ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রতিটি ঋণ আবেদনের বর্তমান অবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এবং আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় গতিশীলতাও বাড়িয়েছে।
পুনঃআবেদনের ক্ষেত্রে সময় সাশ্রয় হয়েছে ব্যাপক: পূর্বে করা আবেদনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংগ্রহ করতে পারে ই-ল্যাপের সিস্টেম ইনকোয়্যারি ফিচার। ফলে, ম্যানুয়াল এন্ট্রির প্রয়োজন হয় না। এটি বাহুল্যতা হ্রাসের পাশাপাশি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার সময় এবং ভুলের পরিমাণ কমিয়েছে।
সেইসাথে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে তাঁদের কর্মপদ্ধতি আরো সহজ এবং দক্ষ করে তুলেছে। মোবাইল ডিভাইস থেকেও ই-ল্যাপে লগইন করা যায়। ফলে, রিলেশনশিপ অফিসার ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজাররা যেকোনো স্থান থেকে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারেন। ব্র্যাক ব্যাংক ইতিমধ্যে ২,২৩৭ জন ফিল্ড কর্মকর্তাকে ইলেকট্রনিক ট্যাবলেট দিয়েছে, যাতে তাঁরা যেকোনো স্থান থেকে গ্রাহকদের উন্নত মানের সেবা দিতে পারেন।
ব্যয় হ্রাসেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে বাতিল আবেদনপত্রের ক্ষেত্রে। যেসব আবেদন বাতিল হতো, আগে সেগুলোও প্রিন্ট করা হতো। এখন কেবল অনুমোদিত আবেদনপত্রই প্রিন্ট করা হয়, যা অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয় প্রিন্টিংয়ের খরচ অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে। ই-ল্যাপের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলো ডেটা এন্ট্রির ভুল কমিয়ে এনেছে। ফলে, ক্রেডিট ও অপারেশনস টিম আরও নির্ভুলভাবে ডকুমেন্ট হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করতে পারছে।
ই-ল্যাপের প্রভাব বহুমুখী এবং সুদূরপ্রসারী। এটি ৫৫৬টি এসএমই ইউনিট অফিস ও লোন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ৩,৭০০-এরও অধিক ব্র্যাক ব্যাংক কর্মীকে সহায়তা করছে।
ই-ল্যাপ শুধু সময়ই নয়, এটি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়ও হ্রাস করেছে। মোট টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম (টিএটি) দুই দিন এবং কাস্টমার সার্ভিস টাইম ছয় দিন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক কর্মীর বছরে কমপক্ষে ১০ দিন সময় সাশ্রয় হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ই-ল্যাপ অনবোর্ডিং খরচে ৫.৮৫ কোটি টাকা এবং কুরিয়ার খরচ ২৫% হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে।
ই-ল্যাপ গ্রাহকদের এক ব্যতিক্রমী ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
আগে সপ্তাহজুড়ে অপেক্ষা করতে হতো এবং বারবার ব্যাংকে যেতে হতো। তবে, এখন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ আবেদন খুব দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যাংশন লেটার তৈরি হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হয়েছে, যা ভুল বোঝাবুঝি ও অভিযোগ হ্রাস করেছে। ই-ল্যাপের কোয়্যারি ম্যানেজমেন্ট ফিচার গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও।