আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছি এবং করছি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। সমৃদ্ধ দেশ গঠনই বঙ্গবন্ধু ও লাখো মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল। সেই লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে। এখন পর্যন্ত এই অঙ্গীকার-প্রতিজ্ঞা অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে, রাজনীতি এখনো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানমূলক ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি তীব্র হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সাম্য প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। গভীর উদ্বেগের বিষয় এই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিকে বিভক্ত করার এক সর্বনাশা তৎপরতা চলছে। অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই এ অপতৎপরতা চলছে। অথচ জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হয়েছিল। বলা হয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক কঠিন। স্বাধীনতা তখনই সুরক্ষিত থাকে যখন জাতি ইস্পাতকঠিন ঐক্যে দৃঢ়বদ্ধ থাকে। যারা জাতিকে বিভক্ত করতে তৎপর তারা মূলত স্বাধীনতাকে অরক্ষিত করে তুলছে। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও একই সমতলে আনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিনি জানতেন এবং বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন, শাসন ইত্যাদির যে চিত্র আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি, তা গভীর উদ্বেগজনক। ক্ষমতা যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং ক্ষমতার জন্য কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন জাতির ভবিষ্যত নিয়ে শংকা জাগা স্বাভাবিক। বলা হয়, জনগণই দেশের মালিক, ক্ষমতার উৎস, অথচ বাস্তবতা হলো, জনগণের মালিকানা এখন জনগণের হাতে নেই। তারা আর এখন ক্ষমতার উৎস নয়। দেশে একতরফা ও জোর-জবরদস্তিমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার অপসংস্কৃতি বিদ্যমান। এহেন গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থায় দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির কাক্সিক্ষত গতি ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এসে আমরা দেখছি, যে লক্ষ্যসমূহ সামনে রেখে জাতির জনকের ডাকে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সে লক্ষ্য অর্জনে এখনো আমাদের বহুদূর যেতে হবে। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সেই স্বপ্ন এখনো অধরা।
গত ৫০ বছরে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। স্থাপত্যগত ও পরিসংখ্যানগত উন্নয়ন হয়েছে, এটা ঠিক। তবে এর বাইরেও মানুষের জীবনমান এবং মানবিকতার উন্নয়ন ঘটানো জরুরি। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে বেকারত্বের হার বেড়েছে, মানুষের আয় কমে গেছে। এর মধ্যে নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিদারুণ দুর্ভোগে পড়েছে। সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ কমানোর জন্য জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। আমরা এখনো অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করতে পারিনি। রাজনীতিতে অনৈক্য, দ্বিধাবিভক্তি, হানাহানি ও দোষারোপ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমাদের জাতীয় লক্ষ্য, অর্জন ও অগ্রগতির জন্য একদিকে যেমন দেশের সব মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন, অন্যদিকে আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিরোধের ইস্যুগুলোকেও অগ্রাহ্য করা যায় না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এখন আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। অতীত চর্চা না করে আমাদের সামনে তাকাতে হবে। ’৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য পূরণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে। নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন, তেমনি দেশে জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক পুনর্গঠনে তার ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তেও তিনি অনুরূপ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হোন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।