কৃষকের লোকসান কমাতে কেজিপ্রতি ২২ টাকা ন্যূনতম দর নির্ধারণ এবং ৫০ হাজার টন আলু কেনার সরকারি ঘোষণা ছিল। কিন্তু ঘোষণার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে হিমাগার ও বাজারে আলুর দাম আরও কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দেশের আলু চাষিরা। উৎপাদন খরচও তুলতে না পারায় তাঁরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত ২৭ আগস্টের সেই ঘোষণার পর বাজারে আলুর দাম উল্টো কমে গেছে। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকায়। অন্যদিকে, হিমাগারের ফটকে আলুর দাম নেমে এসেছে ৯ থেকে ১১ টাকায়। অথচ মুন্সীগঞ্জের মতো অঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২৬ থেকে ২৮ টাকা, যেখানে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ টাকায়।
কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের এভাবে লোকসানের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ৩৫ কোটি টাকা।
হিমাগারে আলুর স্তূপ, হতাশায় কৃষক
দেশের ৩৪০টি হিমাগারে এখনও প্রায় ২০ লাখ টন আলু অবিক্রিত অবস্থায় মজুত হয়ে আছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। চাষিরা বলছেন, ২২ টাকা দাম ঘোষণার আগে আলুর দর কিছুটা ভালো (১৬-১৭ টাকা) ছিল, কিন্তু ঘোষণার পর সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় উল্টো দামে ধস নামে।
রাজশাহীর তানোরের কৃষক রানা চৌধুরী জানান, তিনি হিমাগারে ১ হাজার ২৫০ বস্তা আলু রেখেছেন, কিন্তু এক কেজিও বিক্রি করতে পারেননি। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "সরকার বলেছিল, ২২ টাকায় কিনবে। এখন ৯ টাকাতেও ক্রেতা নেই।" মুন্সীগঞ্জের কৃষক সাহারা বেগম জানান, আলুর জন্য নেওয়া সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ এখন তাঁর ঘাড়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর ও লালমনিরহাটের পরিস্থিতিও অভিন্ন। জয়পুরহাটের ১১টি হিমাগারে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা।
দরপতনের কারণ: অতিরিক্ত উৎপাদন ও অব্যবস্থাপনা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ৫.২৪ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে, যা বার্ষিক চাহিদা (৯০ লাখ টন) থেকে প্রায় ৪০ লাখ টন বেশি। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, অতিরিক্ত উৎপাদন, রপ্তানি বাজারের সীমাবদ্ধতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এই সংকটের মূল কারণ। সরকার সময়মতো হস্তক্ষেপ না করায় কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বিসিএসএ-এর দাবি: দ্রুত প্রণোদনা
আলুচাষিদের বাঁচাতে দ্রুত ঘোষিত ৫০ হাজার টন আলু কেনা শুরু করার দাবি জানিয়েছে হিমাগার মালিকদের সংগঠন বিসিএসএ। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, লোকসানে পড়া কৃষকরা যদি নিরুপায় হয়ে হিমাগারে সংরক্ষিত বীজ আলু (প্রায় ৯ লাখ টন) খাবার আলু হিসেবে বিক্রি করে দেন, তবে আগামী বছর দেশে আলুর উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফলে গত বছরের মতো আবারও আলুর কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় ঠেকতে পারে।
সংগঠনটি কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অক্টোবরের মধ্যেই আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
এদিকে টিসিবি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সাল আজাদ জানিয়েছেন, সরকার খুব শিগগিরই আলু কেনা শুরু করবে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে সরকারকে এখনই পরিকল্পিত বাফার স্টক গড়ে তোলা এবং রপ্তানির নতুন বাজার খুঁজে বের করা জরুরি।