সিলেট মাদরাসা ময়দানের আয়োজিত লাখো জনতার উপস্থিতিতে সভায় স্থানীয় ভোটারদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ইলিয়াস, জুনায়েদ, দিনারসহ হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি, চব্বিশের গণ-আন্দোলনে সিলেট শহরে ১৩ জন জীবনদান করেছেন, এই প্রাণগুলোর বিনিময়ে যে অধিকার আদায়ের পথে আমরা নেমেছি, একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা যায়।
ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষ রাজনৈকি দল ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রি করছে, এমন কাজ স্পষ্টতই শিরক ও গুরুতর গুনাহের শামিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সব কিছুর মালিক আল্লাহ। সেই জান্নাতের মালিকও আল্লাহ। কিন্তু একটি দল জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে নিজেরা শিরক করছে, মানুষকে ঠকাচ্ছে। যারা মুসলমান তাদের শিরক করাচ্ছে তার তাদের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। নাউজুবিল্লাহ। এর আগে বক্তব্যের এক ফাঁকে হঠাৎ করে বলেন, উপস্থিত জনতার মধ্যে কে আছেন ওমরাহ বা হজ করেছেন। তার এই ডাকে সাড়া দিয়ে কয়েকজন হাত তুলেন। এ সময় সুনামগঞ্জের এ টি এম হেলাল নামের একজনকে ডেকে নেন কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ওমরাহ করছেন, হজ করেছেন, তাহলে কাবাঘরের মালিক কে? তৎক্ষণাত এ টি এম হেলাল দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, আল্লাহ। এভাবে একে একে প্রশ্ন করেন তারেক রহমান। তার উত্তরে হেলালের সাথে সমস্বরে উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী বজ্রধ্বনি তুলে বলেন, আল্লাহ, আল্লাহ। এরপর তারেক রহমান বলেন, কয়েক দিন ধরে খেয়াল করছি, দেশের ভেতরের কিছু কিছু মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ডাকাতি শুরু করেছে। ঠিক যেমন ফ্যাসিস্টরা ভোটাধিকার হরণ করেছিল, একই রকম ডাকাতি শুরু করেছে একটি কুচক্রী মহল। এদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে আমাদের।
তারেক রহমান বলেন, সিলেটের মানুষদের বড় একটি অংশ লন্ডনে যান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যান। আমরা তাদের বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিতে চাইÑ প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চাই। সরকার গঠন করলে আমরা তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলব, যাতে সারা পৃথিবীতে তাদের ছড়িয়ে দিতে পারি। তারেক রহমান বলেন, টেক ব্যাক বাংলাদেশের আরেকটি বড় কাজ বাকি আছে। আমাদের দেশের লাখ লাখ যুবক-যুবতী, তরুণ সমাজের সদস্য বেকার হয়ে বসে আছেন। আমরা তাদের বেকার করে রাখতে চাই না। এই বেকারদের জন্য আমরা কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই। তিনি আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন মা-বোনদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আগামী ধানের শীষের বিএনপি সরকার সেই শিক্ষিত মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায় সে কারণে ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষকে বিজয়ী করতে হবে।
জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ জনসভায় তারেক রহমান আরো বলেন, গত ১৫-১৬ বছর এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দিয়ে দিয়েছিল। সে জন্য আমি বলেছি, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’। আমি আরো বলেছিলাম, ‘টেইক ব্যাক বাংলাদেশ’। সেই পথের আমরা অর্ধেক পেরিয়ে এসেছি। স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছি। এখন বাকি অর্ধেকটা পেরোতে হবে। ভোটাধিকার আদায় করতে হবে। বাংলাদেশকে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছি। এখন ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশকে গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। এ জন্যই আরেকটা কথা বলি, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, সিলেট থেকে সড়কপথে ঢাকা যেতে এখন ১০ ঘণ্টা লেগে যায়। সিলেটের অনেক মানুষ লন্ডন থাকেন। সিলেট থেকে ঢাকা যেতে যত সময় লাগে, লন্ডন যেতেও তত সময় লাগে না। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিগত ১৫-১৬ বছরে উন্নয়নের নাম করে কীভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। আজকে এই যে ঢাকা থেকে সিলেট বা সিলেট থেকে ঢাকার যে মহাসড়ক; ২০০৫ সালে আমি এসেছিলাম সুনামগঞ্জে, বন্যা হয়েছিল। আমার আসতে লেগেছিল সাড়ে চার ঘণ্টার মতো। কিন্তু আজ আজ আমরা দেখি ১০ ঘণ্টার মতো লাগে। সিলেটের এই পুণ্যভূমির মানুষ বহু মানুষ আছেন, যারা লন্ডনে যাতায়াত করেন; লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে নাÑ এই হচ্ছে উন্নয়নের ফিরিস্তি।
তারেক রহমান বলেন, কেউ কেউ বলে, অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি। এবার একে দেখেন। ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধ, যে যুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি, সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি।
মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর সঞ্চালনায় সমাবেশে দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভা মঞ্চে পৌঁছান তারেক রহমান। এ সময় নেতাকর্মীরা ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম, সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে, লাল গোলাপ শুভেচ্ছা, ভোট দেবো কিসে, ধানের শীষে, লাগারে লাগা, ধান লাগা’ স্লোগান দিতে থাকেন। ১২টা ৫৮ মিনিটে তারেক রহমান বক্তব্য শুরু করেন। ১টা ২৫ মিনিটে তার বক্তব্য শেষ হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। গুম হয়েছে, খুন হয়েছে; কিন্তু মাথা নত করেনি। জিয়াউর রহমানের দর্শন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশের উন্নয়ন। আজকে সিলেট থেকে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হলো। তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি দল আছে, যারা আমাদের দল, আমাদের নেতার বিরুদ্ধে নানান কুৎসা রটনা করছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। সেই দল সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে কাঠানোর পর সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তারেক বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। গত বুধবার একটি ফ্লাইটে সিলেট আসার পর রাতে যান তার শ্বশুরালয়ের। এরপর গতকাল সকালে সিলেটের তরুণদের সঙ্গে মিলিত হন এক মতবিনিময় সভায়।