অন্যদিকে আদেশের সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা রাজনৈতিক বিষয় আদালতে না আনার দাবি জানিয়েছেন। তারা আদালতে বলেন, যে ঠিকানায় আদালতের রুলের নোটিশ জারি করা হয়েছে সেটা বিএনপির পার্টি অফিস। সঠিক ঠিকানায় নোটিশ জারি না হওয়া পর্যন্ত রুল শুনানি করা ঠিক নয়। এখানে রাজনৈতিক দলের নেতার কণ্ঠ রোধ করতেই কোর্টকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে বাদী পক্ষ।
তারা বলেন, এটা একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে তা অন্যায্য, আইনানুগভাবে হচ্ছে না। সবকিছুরই ইতিহাস থেকে যায়। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে যেন কেউ কোনো স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, কণ্ঠরোধ না করতে পারে সেদিকে কোর্টেরও লক্ষ্য রাখা উচিত।
এ সময় আদালত বিএনপির আইনজীবীদের বুঝিয়ে বলেন, দেওয়ানি কার্যবিধি ও হাইকোর্ট রুলস অনুসরণ করেই আমরা আদেশ দিয়েছি। আমাদের জানামতে আদেশ ঠিক আছে। বাদী পক্ষ এসেছে আর আমরা আদেশ দিয়েছি তা তো করিনি। আইন অনুসরণ করেই রুল শুনানির দিন ধার্যের আদেশ দেয়া হয়েছে। আপনারা আদেশ পড়ে দেখেন।
এ সময় বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, এটা একটা রিট মামলা। এই মামলায় তারেক রহমান পলাতক নন। একজন ব্যক্তি হিসাবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ যেতে পারে না।
এরপর সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, যেনতেনভাবে নোটিশ জারি করলে হবে না, সঠিক ঠিকানায় নোটিশ জারি করতে হবে। যে ঠিকানার (৬ মইনুল রোড) কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটা তো সরকারের জায়গা। সেখানে এখন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। হাইকমিশনের মাধ্যমে তার ঠিকানা জেনে নেয়ার সুযোগ রয়েছে বাদীর। তিনি বলেন, যিনি বাদী পক্ষের আইনজীবী তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। এই কোর্টকেই কেন উনি বেছে নিলেন?
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, এখানে হাইকমিশনের বিষয় কেন আসছে?
আইনজীবী বলেন, সঠিক ঠিকানা জানতে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, তারেক রহমান দেশের বাইরে আছেন তাই নোটিশ সঠিকভাবে জারি হয়নি। যিনি এই মামলার বাদী তার দায়িত্বও বিবাদীর সঠিক ঠিকানা সংগ্রহ করা। যেহেতু বিবাদী বিদেশে সেহেতু হাইকমিশনের মাধ্যমে ঠিকানা সংগ্রহ করার দায়িত্ব বাদীর। শূন্যের ওপর আদালত কোনো আদেশ দিতে পারে না।
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, আমরা যতটা দেখেছি আইন অনুযায়ী নোটিশ জারি হয়েছে। বাদী যেটা জানে তার বাইরে তো যাওয়ার সুযোগ নেই।
শুনানি শেষে আদালত তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশে নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে জারি করা রুল শুনানির জন্য কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আইনজীবী কামরুল ইসলাম, সানজিদা খানম ও নাসরিন সিদ্দিকা লিনা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম মুনীর ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
অন্যদিকে হাইকোর্টের আদেশের পর আদালতে উপস্থিত বিএনপির আইন সম্পাদক কায়সার কামাল ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল আদালতে বলেন, এই মামলার বিবাদী তারেক রহমানকে আইন অনুযায়ী নোটিশ দেয়া হয়নি। তিনি লন্ডনে থাকেন। বিষয়টি রিট আবেদনকারীরা জানার পরও বিএনপির রাজনৈতিক কার্যালয় গুলশানের ঠিকানায় নোটিশ দিয়েছে। তারা আইন অনুস্মরণ করে রুল শুনানির আগে লন্ডনের ঠিকানায় নোটিশ দিতে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এদিন সকালে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার বন্ধ করা প্রশ্নে রুল শুনানির পূর্বে গুলশানের ঠিকানায় নোটিশ পাঠানোর আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালন হয়েছে কিনা- সে বিষয়ে শুনানির একপর্যায়ে মঙ্গলবার সকালে হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল হয়।
সকালে শুনানি শুরু হওয়ার পর আদালত আইনজীবীদের কাছে জানতে চান নোটিশ জারি করার আদালতের নির্দেশ পালন হয়েছে কিনা।
তখন আওয়ামীপন্থী আইনজীবী ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, আদেশ অনুযায়ী ঠিকানায় পাওয়া যায়নি। কোর্টের আদেশ ছিল ঠিকানায় নোটিশ লটকিয়ে দেয়া। সেটা হয়েছে। এছাড়া আদেশ অনুযায়ী আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি।
এরপর আদালত বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নোর্টিশ বোর্ডে নোটিশ দেয়ার রিপোর্ট নেই।
এ সময় আইনজীবী কামরুল ইসলাম বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নোর্টিশ বোর্ডে নোটিশ দেয়ার রিপোর্ট আসেনি। তখন আদালত বলেন, রিপোর্ট আসুক। আপনারা ২টায় আসেন।
এ পর্যায়ে বিএনপির আইন সম্পাদক কায়সার কামাল বলেন, মাইলড আগামীকাল শুনারি জন্য রাখেন। রিপোর্ট আসুক।
এ সময় অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম চিৎকার করে বলেন, আপনার দরকার কি? এতে আদালতে উপস্থিত থাকা বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা চিৎকার করতে থাকেন।
এরপর অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, বলেন এটা কী? তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা আদালতে চিৎকার হট্টগোল করেন।
এরপর বিএনপির আইন সম্পাদক কায়সার কামাল বলেন, তিনি কোর্টের সামনে আমাদের থ্রেট করছেন। কোর্টের বাইরে গেলে কী করবেন। আমরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছি।
এরপর আদালত দুপুর ২টায় এ বিষয়ে শুনানির জন্য রাখেন। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা আদালত কক্ষ ত্যাগ করেন।
একই সময়ে হাইকোর্টের দুই বেঞ্চে খালেদা জিয়া ও তারেক রমানের মামলার শুনানি:
একদিকে মঙ্গলবার একই সময় নাইকো দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন বাতিল চেয়ে আবেদনের শুনানি এবং তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার আবেদনের হাইকোর্টের পৃথক দুই বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
মঙ্গলবার দুপুর ২টার পর হাইকোর্ট বিভাগের মূলভবনে ২৩ নম্বর কোর্টে নাইকো দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়ার আবেদনের শুনানি করেছেন বিএনপির আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। অন্যদিকে এনএক্স ১৫ নম্বর কোর্টে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞায় রুল শুনানির জন্য দিন নির্ধারনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিচ্ছেলেন বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টা কায়সার কামালসহ বিএনপিপন্থী আরো কয়েকজন আইনজীবী।
একই সময়ে দুটি মামলা দুইকোর্টে চলাকে অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির আইন সম্পাদক আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, বর্তমানে সংকটময় রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দেশের সব চাইতে আলোচিত হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সাহেব। আমরা যেটা সব সময় বলি সেটা হচ্ছে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারেক রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়েরকৃত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছে। যেগুলো এই মূহর্তে আদালতের সামনে আসার কথা না, সেই বিষয়গুলা টেনে নিয়ে আসা হয়েছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে রুল ইস্যু হয়েছিল, এত বছর তাদের কোনো খবর ছিল না। এখন যেহেতু রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল এই অবস্থায় তারেক রহমানকে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা মনে করি এটা অনভিপ্রেত, অসাংবিধানিকও বটে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারনেই একইসঙ্গে একই সময়ে নিয়ে আসছে।
একইসাথে দুই মামলা চলমান বিষয়ে তিনি বলেন, একই সময়েই তো আমরা অনেক মামলাই করি, কিন্তু এই দুইটি মামলাতো স্বাভাবিক মামলা না। মামলার গতিপথও স্বাভাবিক না। এখন মামলার শুনানিও হচ্ছে অস্বাভাবিক গতিতে।
তবে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের অভিযোগ অস্বীকার করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারোয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, এটা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য। বরং নাইকো মামলা তাদের জন্যই বিচারিক আদালতে আটকে আছে, সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না। এখানেও তারা শুনানি করছেন। দ্রুত শেষ করছেন না। এই মামলার জন্য হাইকোর্টের অন্যান্য মামলার শুনানি হেম্পার হচ্ছে। তিনি বলেন, এজন্য আদালত আগামী রোববার বেলা ১১টা থেকে টানা শুনানি করে শেষ করতে বলেছেন।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট প্রিন্ট, ইলেকট্রিক ও অনলাইনসহ গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার বন্ধ করা প্রশ্নে জারি করা রুলের নোটিশ রিটে উল্লেখিত তারেক রহমানের ঠিকানা ভুল থাকায় তা সংশোধন করে তারেক রহমানের গুলশানের ঠিকানায় নোটিশ পাঠানোর আদালতের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
এর আগে গত ৮ আগস্ট এ মামলার শুনানি নিয়ে আদালতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। ওইদিন উভয়পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট বলেন, রুলস অনুযায়ী অবশ্যই নোটিশ দিতে হবে তারেক রহমানকে। তবে সেটা কোন প্রক্রিয়ায় তার উপায় খুঁজতে হবে। বিকল্প পদ্ধতি বের করতে হবে।
২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার নিয়ে এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো: সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রুলসহ অর্ন্তর্বতীকালীন এ আদেশ দেন।