এদিকে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা শপথ নিলেও ১৮ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদের প্রথম সভায় মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন করা হয়। মুজিবনগর সরকারের সফল নেতৃত্বে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের এই প্রথম সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এর আগে ভারত ও ভুটান এ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
ঐতিহাসিক মুজিবনগরেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে একত্রিত হয়েছিলেন। এদিন নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের বহু বিখ্যাত সাংবাদিক। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়া এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান প্রমুখ শপথ নেন মন্ত্রী হিসেবে। এই সরকারই ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসেবেও এই সরকারের একটি পরিচয় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে প্রবাসী ‘মুজিবনগর সরকার’ বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিল। তাঁদের সুযোগ্য নেতৃত্বেই জাতি ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
ওই সরকারের সকল কৃতিত্বের সূচনা হয়েছিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান থেকে। ওই সরকারের অধীনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রশাসন, প্রচারণা, কূটনীতি ও যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে সারাদেশকে কয়েকটি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। মুজিবনগর সরকার প্রতিটি সেক্টরের দায়িত্ব দিয়েছিল একেকজন সেক্টর কমান্ডারের হাতে। মুক্তিযুদ্ধকালে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছিল ভারত। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরও কিছু রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ‘মুজিবনগর দিবস’-এর যথাযথ মর্যাদা ও মূল্যায়ন করে আসছে। এ দিবসটির পথ ধরেই বাঙালি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
মুজিবনগর দিবসের ইতিহাসসহ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখন দেশবাসী বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাতে ইতিহাসের বিকৃতি রোধ করা সম্ভব হবে। এটা সবার জন্য সুখের ও স্বস্তির কথা যে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে আত্মত্যাগ, রক্তদান ও উত্তরাধিকারের এক সম্মিলিত অনন্যসাধারণ আদর্শের নাম বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্ব ও সুদক্ষ পরিচালনায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জীবনে মুজিবনগর দিবসের তাৎপর্য ও গভীরতা অপরিসীম। জাতি তা গর্বভরে স্মরণ করবে চিরদিন।
লেখক: নিজাম উদ্দিন হাজারী
সংসদ সদস্য, ফেনী-২ (সদর) ও ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।