অধ্যাপক মমিন উদ্দিন বলেন, ‘এই নতুন পেনশন এখন থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগ দেবেন, তাদের জন্য কার্যকর হবে৷ আমরা অধ্যাপকরা অবসরে গেলে পেনশন পাবো সরকারি নিয়মে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা করে৷ কিন্তু এখন লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়ে যারা অবসরে যাবেন, তারা বেতনের ১০ শতাংশ করে দিয়ে অধ্যাপক হওয়ার পর অবসরে গেলে মাসে পাবেন এক লাখ ২৪ হাজার টাকা করে পেনশন৷ আমরা হিসাব করে দেখেছি, তারা চাকরি জীবনে যে পরিমাণ টাকা দেবেন, তা ব্যাংকে রাখলে যে আসল ও প্রিমিয়াম পাবেন তা-ও সমপরিমাণ৷’
‘ফলে নতুন পেনশনে নানা দিক থেকেই আমাদের সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং এটা বৈষ্যম্যমূক৷ এটা আমাদের ওপর প্রভাব না ফেললেও নতুন যারা আসবেন, তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে৷ সরকারি চাকরি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার একটি বিষয় হলো অবসর জীবনে একটু ভালো থাকা, নিশ্চিত থাকা৷ কিন্তু এরকম হলে তো মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন’, যোগ করেন ড. মমিন উদ্দিন৷
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন পেনশন ব্যবস্থায় আমাদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন জারি করে আমাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে৷ বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনাও করা হয়নি৷ আমাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকাই আসলে সুদসহ আমাদের ফেরত দেওয়া হবে৷ এখানে সরকারের কোনো অংশগ্রহণ আসলে থাকবে না৷ এটা নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি করবে৷’
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আর নতুন নিয়মে অবসরের বয়স বলা হয়েছে ৬০ বছর৷ কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর৷ অর্জিত ছুটির বিপরীতে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা নেই৷ বছরে পেনশন পাঁচ শতাংশ হারে বাড়ে৷ নতুন নিয়মে বাড়বে না৷ অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটির ব্যাপারে কিছু বলা নেই৷ মাসিক চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতার ব্যাপারে কিছু বলা নেই।’
ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এই পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আমাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের একাধিক বৈঠকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত পর্যায়ে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷’
অর্থ বিভাগ গত ১৩ মার্চ সর্বজনীন পেনশন কর্সসূচি ‘প্রত্যয়ের’ প্রজ্ঞাপন জারি করে৷ এই কর্মসূচি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) সব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বীমা করপোরেশনসহ সব করপোরেশন, পেট্রোবাংলা, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিএসটিআইসহ প্রায় ৪০০ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য৷ ১ জুলাই সোমবার থেকে এটা কার্যকর করা হয়েছে৷ ১ জুলাই থেকে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেবেন তারা এই নতুন পেনশনের আওতায় পড়বেন৷
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনও প্রচলিত সরকারি পেনশন নীতির আওতায়ই আছেন৷ তবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তার বাজেট বক্তৃতায় সরকারি চাকরিজীবীদেরও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার কথা বলেছেন৷ সেটা ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চালু হবে৷ তার নাম হবে ‘সেবক’৷
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের আগামী বছর সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নেওয়া হবে৷ তাদেরটার নাম হবে সেবক৷ তাদের জন্য আলাদা কেন? আর এক বছর পরে কেন? আমাদেরও সরকার সেবকে নিক এবং একই সময়ে নিতো৷ আমাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হলো কেন? এসব কী? এর নিশ্চয়ই ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে৷ এটা অবশ্যই বৈষ্যম্যমূলক৷’
অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘আমরা এই পেনশনে যে ক্ষতি ও বৈষম্য তা গবেষণা করে সরকারকে জানিয়েছি৷ শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে দেখা করেছি৷ কিন্তু, আমরা কোনো সমাধান পাইনি৷ তাই বাধ্য হয়ে আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেছি৷ আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে৷ এটা আমাদের মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন৷’
এদিকে সরকারের দিক থেকে এই কর্মবিরতির ব্যাপারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া গতকাল সোমবার পাওয়া যায়নি৷ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে৷ তবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী রোববার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পেনশন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, সব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা কিছু করতে হলে সেইভাবেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে৷’ সর্বাত্মক কর্মবিরতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলবস্থা হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সবার রাজনীতি ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার আছে৷ পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷’
চারটি আলাদা কর্মসূচি নিয়ে সর্বজনীন পেনশন শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট থেকে৷ এগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা৷ কর্মসূচিগুলোর আওতায় এখন পর্যন্ত তিন লাখ ৩২ হাজার ৭৭৩ জন গ্রাহক হয়েছেন৷ জমা পড়েছে ৯৭ কোটি টাকা৷ আর ১ জুলাই থেকে শুরু হলো আরেকটি স্কিম প্রত্যয়৷
সূত্র: ডয়চে ভেলে