রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাকে সাময়িকতার সংস্কারমুক্ত করেছেন।তিনি নিজেই বলেছেন, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করবার ভার তিনি মহাকালের উপর দিয়েছেন। আধুনিক বাংলা কাব্যে রবীন্দ্র পরবর্তীদের মধ্যে অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় আঙ্গিকের বিচিত্র আবহের ভেতর দিয়ে জীবনের অনুধ্যান ফুটিয়ে তুলেছেন বলে জীবনানন্দ মনে করেন। হপকিনসের কাছে অমিয় আঙ্গিকের ইশারা পেয়েছেন।
বুদ্ধদেবের কবিতায় বহিঃপ্রসাধন ভেতরের বহ্নিকে স্তিমিত করতে পারেনি। তার কাব্যে জীবনদর্শন রয়ে গেছে। তিনি অমিয় বাবুর মতো আশা ভরসা বিশ্বাসী। সুধীন্দ্রনাথের ”উত্তর ফাল্গুনী“ প্রভৃতি কবিতার কাব্য শরীরের নতুনত্ব তাদের আত্মার ভেতরে বলে জীবনানন্দের মন্তব্য। তিনি আরো বলেন, সুধীনের এসব কবিতা হঠাৎ পড়লে মনে হয়-রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে অন্তর্যামী শিষ্যের লেখা।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক দেবেন্দ্রনাথ সেন প্রমূখের কবিতায় অরাবীন্দ্রিক সুর পেলেও তারা আধুনিকতার প্রবর্তক নন। জীবনানন্দ মনে করেন - আমাদের দেশে স্বয়ং রবীন্দ্রের সৃষ্টিরহস্যোৎসারিত বড় কাব্যের পরে নতুনতর বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েও বিশ্বরহস্য সম্বন্ধে নতুন দায়িত্বপূর্ণ মহদুক্তি করবার মতো ভাবনা- প্রতিভার একান্তই অভাব।রবীন্দ্র বিপরীত তথাকথিত আধুনিক কবিগণ সাহিত্যে কল্পনা- প্রতিভার দাবি উপেক্ষা করে কবিতায় মননজীবী বিশুদ্ধ রসের অবতারণার বিরোধী।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সেসব কবিগণ অভিযোগ খাড়া করলেন - রবীন্দ্রনাথ ঐশ্বর্যশালী, জনআন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন, তিনি আধ্যাত্মিক সত্যে বিশ্বাসী এবং বুর্জোয়া সভ্যতার প্রতীক। এসব বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে জীবনানন্দ জোর দিয়ে বল্লেন- “ রবীন্দ্র সাহিত্য ও কবিজীবন দেশ ও জাতির মেরুদ- গঠন করতে গত পঞ্চাশ - ষাট বছর ধরে যেভাবে নিজেকে ক্ষয়িত করেছে, বাঙলা ছাড়া অন্য কোন দেশে হলে হয়তো বা তার অপেক্ষাকৃত সুব্যবহার হত। তাছাড়া আধ্যাত্মিক সত্য শূন্যবাদের চেয়ে কাব্যসৃষ্টিতে তা ঢের বেশি জীবনীশক্তি দিতে পারে। প্রাজ্ঞ জীবনানন্দ তুলনা করে বল্লেন,- “পাউন্ড ও এলিয়টও বুর্জোয়া সভ্যতার জীব,এবং রবীন্দ্রনাথের চেয়ে কখনোই সেই সভ্যতার তীব্রতর সমালোচক নন, আধ্যাত্মিক সত্যে এলিয়টও গভীর বিশ্বাসী। জনসাধারণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ঢের বেশি সংকুচিত ও উপেক্ষণীয় “।সর্বোপরি জীবনানন্দের বিচারে বাংলা কাব্য ভুবনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কাব্য প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ। জীবনানন্দের উচ্চারণ :
“ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে সাহায্য ও ইঙ্গিত পেয়ে আজ যে আধুনিক কাব্যের ঈষৎ সূত্রপাত হয়েছে তার পরিণাম - বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথের ভিত্তি ভেঙে ফেলে কোনো সম্পূর্ণ অভিনব জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে, সাহিত্যের ইতিহাস এ রকম অজ্ঞাতকুলশীল জিনিস নয়।ইংরেজ কবিরা যেমন যুগে যুগে ফিরে শেক্সপীয়র এর কেন্দ্রিকতার থেকে সঞ্চারিত হয়ে বৃত্ত রচনা করে ব্যাপ্ত হয়ে চলেছে, আমাদের কবিরাও রবীন্দ্রনাথকে পরিক্রমা করে তাই করবে.......”।
এবার বাংলা কাব্যের অপর সাড়া জাগানো প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই। আমাদের জাতীয় কবি ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের সঙ্গীত বৈশিষ্ট্য বিশেষত এত বেশি গান রচনার দৃষ্টান্ত বিশ্ব সাহিত্যে বিরল।তিনি তিন হাজারেরও বেশি গানের রচয়িতা। রবীন্দ্রনাথ রচিত গানের সংখ্যা ২২৩২। শেক্সপিয়ার রচিত গানের সংখ্যা ৬ শতাধিক। শৈলী, বিষয়বস্তু ও জনপ্রিয়তা বিচারে যেসব গান বিশ্বে সমাদৃত। বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে নজরুলের অবদান অসামান্য। নজরুল সাহিত্যের পর্যালোচকরা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধ শান্ত কাব্যধারায় নজরুল অদম্য প্রাণপ্রবাহ জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন।পদ্যের প্রকাশভঙ্গীতে স্বতন্ত্র তরঙ্গ নিয়ে তিনি আবির্ভূত হলেন।নজরুল কাব্যের ভাব ভাষা শব্দ ছন্দ অলংকার প্রয়োগে নতুন শিল্প সৃষ্টি বিস্ময়কর। বিশেষ করে এমন তেজোদ্দীপ্ত ঝংকার নজরুলের পূর্বে আর কেউ দেখাতে পারেননি।
“ আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন / আমি খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন ( বিদ্রোহী)
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির বাণী নজরুলের মতো কেউ উচ্চারণ করেননি।তাই স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী মননের উদ্দম প্রকাশ :
“ আমি অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল / আমি দলে যাই যত বন্ধন / যত নিয়ম - কানুন - শৃঙ্খল / আমি মানি নাকো কোন আইন.....
ব্যক্তি বিকাশের সুন্দর সম্ভাবনার পথ এবং মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিকাশের সৌম্য সুর বেজে উঠেছে ‘ বিষের বাঁশি ‘, ভাঙার গান,সর্বহারা প্রভৃতি কাব্যে।এ যেন সমসাময়িক জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মুক্তির আকাঙ্খা :
“ আসিতেছে শুভদিন - দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা,শুধিতে হইবে ঋণ।........
মজুর,মুটে ও কুলি, তোমাদের বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগালো ধূলি, তারাই মানুষ তারাই দেবতা গাহি তাহাদের গান/ তাদের ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান। ( কুলি মজুর)।
নজরল কাব্যে পদবিন্যাস রীতিতে ইংরেজি বিধানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে আরবি, ফারসি ভাষার সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার অপূর্ব অর্থব্যঞ্জনা লাভ করেছে। হিন্দু, মুসলিম ঐতিহ্য সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। নজরুল তৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি সব রকম শব্দই কাব্যে ব্যবহার করেছেন। ইসলামের সাম্য ও সম্প্রীতির বাণী ঘোষণা করার লক্ষ্যে কবির লেখনী ছিল দুর্বার, গতিশীল।
আরবি, ফারসি শব্দের নৃত্যচপল তরঙ্গদোলায় তার দরদি মনের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে-
১. কারও আঁখি জলে কারও ঝাড়ে কিরে জ্বলিবে দীপ
দুজনার হবে বুলন্দ নসিব লাখে লাখে হবে বদনসিব
এ নহে বিধান ইসলামের। (ঈদ মোবারক)।
ভাবানুসারী ছন্দ নির্মাণে নজরুলের কৃতিত্ব অপরিসীম। তিনি ব্যথা-দীর্ণ বিরহী হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি অঙ্কনে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মূর্ছনা সৃষ্টি করেছেন। শান্ত রস, ধীরলয় ও বিলম্বিত গতির এ ছন্দ বিরহ বিধুর ভাব পরিমন্ডল সৃষ্টিতে অনন্য।
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না কোলাহল করি সারা দিনমান কারও ধ্যান ভাঙ্গিব না,
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধূপ। (বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম এর পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাহিত্যিক সৌহার্দ্য অতুলনীয়। যেখানে নজরুলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি পরিদৃশ্যমান।
১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে কবি সম্বোধন করে তাঁর বসন্ত নাটক উৎসর্গ করেন।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত একবার নজরুলকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাই নতুন ঢেউ এনেছ। আমরা তো নগণ্য, স্বয়ং গুরুদেবকে পর্যন্ত বিস্মিত করেছ তুমি।
ধূমকেতুর ১২‘শ সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) প্রকাশিত নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক একটি প্রতীকধর্মী কবিতা প্রকাশের পর তাঁকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ মামলা করা হয়। এই বছরই ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগারে থাকাবস্থায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। রবীন্দ্রনাথ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ডেকে বলেন, ‘জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি।......... জানি, তোমাদের মধ্যে কেউ এটা অনুমোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এই মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।’ রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন ‘নজরুলের কাব্যে অসির ঝনঝনানি আছে। আমি যদি তরুণ হতাম তা হলে আমার কলমেও ওই একই ঝংকার বাজতো।’
ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতায় পত্রিকার নামের নিচেই রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী।
কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,/আধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,/দুর্দিনের এই দুর্গ শিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।/অলক্ষণের তিলক রেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা,/জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন।
১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নজরুল প্রকাশ করলেন নতুন পত্রিকা লাঙল। এবারেও লাঙল-এর সূচনায় থাকলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখলেন: ধর হাল বলরাম আন তব মরু-ভাল হল/বল দাও ফল দাও স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।
এরই মাঝে নজরুল ইসলাম কবিতা ও গানের অনেকগুলো বই নিয়ে বের করলেন সঞ্চিতা। উৎসর্গবাক্যে লিখলেন, ‘বিশ্বকবি সম্রাট শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রী শ্রী চরণারবিন্দেষু।’
কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর প্রধান বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, সম্পাদক। তাঁর মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে সৃষ্টির প্রাচুর্য বিস্ময়কর। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি কবি। বিংশ শতাব্দির বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব গগনচুম্বী। জাতীয় কবি নজরুলের কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তা বাংলাভাষী পাঠকের মধ্যে অতলস্পর্শী। তাঁর মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধতা এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় একশ বছর ধরে বাঙালির মানস গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে।