কাবার আদলে কবর, অতঃপর উত্তপ্ত জনতা
গত ২৩ আগস্ট বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় বিতর্কিত নূরা পাগলার। তার অনুসারীরা স্থানীয়ভাবে এক 'মাজার' নির্মাণ করে, যা অবিকল কাবা শরীফের আদলে বানানো হয়। শুধু তাই নয়, তাকে দক্ষিণমুখী করে দাফন, প্রতি শুক্রবার তাওয়াফের মতো করে কবর প্রদক্ষিণ, এবং মাজারকে 'ইমাম মাহদীর মাজার' হিসেবে প্রচার এসবই ইসলামি শরিয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী কাজ।
প্রথমে মুসল্লিরা প্রতিবাদ করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। এতে ক্ষোভ বাড়তেই থাকে। গত শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজ শেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত জনতা প্রথমে মাজারটি ভেঙে ফেলে, পরে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে রাস্তায় এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
কে এই নূরা পাগলা?
গোয়ালন্দের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরুল হক ওরফে নূরা পাগলা আশির দশকে নিজেকে 'ইমাম মাহদী' ঘোষণা করে এক ‘দরবার শরীফ’ চালু করেন। দাবি করেন আসল কালেমা হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মাহদী রাসুলুল্লাহ'। মুসলিমদের মহাগ্রন্থ আল-কোরআনকে বলতেন 'ভুজপাতা',আযান বিকৃত করাসহ নানা বিদআতি ও শিরকী কাজ চালিয়ে যান বহু বছর ধরে। গাঁজাসহ বিভিন্ন নেশার আসরও বসাতো তার বাসভবনে।
দীর্ঘ সময় জনতার চাপ ও আলেমসমাজের প্রতিবাদের মুখে তিনি এলাকা ছাড়লেও আবার ফিরে এসে কার্যক্রম শুরু করেন। প্রশাসনের চুপ থাকা এবং অনুসারীদের বাড়তে থাকা দাপটে স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিলেন।
হিরো বানানোর পেছনে কারা?
নূরা পাগলার মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন তার বড় ছেলে নূরতাজ নোভা, যার বিরুদ্ধে উঠেছে আরও ভয়ানক অভিযোগ। শুধু ধর্মীয় ভণ্ডামিই নয়, বরং মুসলিম তরুণ-তরুণীদের খ্রিষ্টান বানানোর একটি সুসংগঠিত চক্র পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত একদল তরুণ-তরুণী নূরতাজ নোভার নেতৃত্বে দলবেঁধে মানুষের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে, গান গাইছে, কথিত 'শান্তির বার্তা' ছড়াচ্ছে। অথচ স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর্মকাণ্ডের পেছনে আছে ধর্মান্তরকরণের সুপরিকল্পিত ছক।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, ঢাকায় বসেই নূরতাজ খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের কাজ চালাচ্ছেন। তার নেতৃত্বে কাজ করছে কমপক্ষে ২৪ জন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম আম্বিয়া বেগম ও শরিফুল ইসলাম বাবু ওরফে ঐন্দ্রিস নোভা। তাদের মূল টার্গেট দরিদ্র ও সহজ-সরল সুন্দরী তরুণীরা, যাদের দিয়ে অন্যদের প্রভাবিত করাটা সহজ।
এছাড়াও একটি পক্ষ সুশীল সেজে নুরা পাগলার হয়ে গলা ফাটাচ্ছে। নুরা পাগলা প্রকাশ্য এক নাস্তিক। ঈমান থাকা অবস্থায় তার পক্ষে সাফাই গাওয়াটা ইসলামের পরিপন্থী। অন্যদিকে নুরা পাগলার ভণ্ড মাতাল সব অনুসারীরা মানববন্ধন থেকে শুরু করে মিডিয়ার সামনেও গলা ফাটাচ্ছে, এদেরকেও ধরে আইনের আওতায় আনা উচিৎ।
প্রশাসনের নির্লিপ্ত ভূমিকা
সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় মুসলিমরা বারবার ভণ্ড নুরা পাগলার বিষয়ে স্মারকলিপি দিলেও প্রশাসনের তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এতে জনমনে জন্ম নেয় অসন্তোষের। একটি বিষয় স্পষ্ট নূরা পাগলার কর্মকাণ্ড শুধু ধর্ম নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও ছিল। তার অনুসারীদের খ্রিষ্টান ধর্মান্তরকারী কার্যক্রম এখন ধর্মীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে চ্যালেঞ্জ
এখন প্রশ্ন হলো এই তথাকথিত ধর্মগুরু ও তার উত্তরাধিকারী চক্রের বিরুদ্ধে সরকার কি কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেবে? নাকি ধর্মীয় অনুভূতিকে উপেক্ষা করে আরেকটি বড় দুর্যোগের পথ খুলে দেবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এ ঘটনায় শুধু উত্তেজিত জনতাকে দোষারোপ করলে চলবে না। বরং এই ষড়যন্ত্রে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে, কিভাবে একটি মুসলিম দেশে ভণ্ড ঈমাম মাহদী সেজে একজন দিনের পর দিন প্রকাশ্যে তার ভক্ত অনুসারী তৈরি করে সেটিও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায়, এমন ভণ্ডরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, আর বারবার ধর্মের নামেই ধোঁকা খাবে সাধারণ মানুষ।
এর পাশাপাশি নুরা পাগলার ছেলের খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করার যে ফাঁদ সেটির সাথে কারা জড়িত এর পিছনে কাদের ইন্ধোন সব কিছুই খুঁজে বের করার দাবী প্রতিটি মুসলিম নাগরিকের। নূরা পাগলা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন বিভ্রান্তির ছায়া, কুসংস্কারের বিষবৃক্ষ, এবং এক ভয়ঙ্কর প্রশ্ন, আমরা কি আরও একটি 'ভণ্ড ইমাম মাহদী' তৈরি হওয়ার আগেই জেগে উঠতে পারব? নাকি মুসলিম দেশ হওয়ার পরও বারবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের গাফিলতিতে ধোঁকার পর ধোঁকা খেয়েই যাবো?